সব পেশারই একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে ॥ ডা. মুহাম্মদ ইলিয়াছ

0
143
views

সুতরাং: এই সময়ে অনেক লাভজনক পেশা থাকতেও চিকিৎসক হতে গেলেন কেন?
ডা. মুহাম্মদ ইলিয়াছ:
বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক পেশা রয়েছে, যে পেশাগুলোতে অর্থ উপার্জন অনেক সহজ। ভিন্নভাবে বলা যেতে পারে—যেভাবে আপনি বলেছেন, দেশে অনেক লাভজনক পেশা রয়েছে। কথাটি সত্যি। আমাদের চারপাশে এর অনেক উদাহরণ রয়েছে। তবে পেশা হিসেবে চিকিৎসা একটি সেবামূলক পেশা। অর্থাৎ এ পেশায় থেকে মানুষের সেবা করার অনেক সুযোগ রয়েছে। যারা এ পেশায় আসেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের মধ্যে মানবসেবার একটা ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়ে থাকে। অবশ্য আমার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। আপনি জানেন যে, আমি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করে পুরোপুরি চিকিৎসা পেশায় না গিয়ে চিকিৎসা শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি বেশি। বর্তমানে আমি ফার্মেসি ও অর্গানন অব মেডিসিন বিষয়ে অধ্যাপনা করছি। তবে এ সেবামূলক পেশার প্রতি আমার যথেষ্ট অনুরাগ ও পক্ষপাত রয়েছে। আমি এ পেশাকে গভীরভাবে উপভোগ করছি।

সুতরাং: আপনি কি মনে করেন. চিকিৎসাসেবা কেবলই সেবা? এর অর্থনৈতিক দিককে আপনি কিভাবে দেখেন?
ডা. মুহাম্মদ ইলিয়াছ:
আমি চিকিৎসাসেবাকে কেবলই সেবা মনে করি না। আমি আগেও বলেছি, চিকিৎসা হচ্ছে একটি সেবামূলক পেশামাত্র। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসা সম্পূর্ণ সেবামূলক হয়েছে এমন উদাহরণ অনেক কম। পক্ষান্তরে নাগরিকদের এ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা ও দুর্নীতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় রয়েছে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও। অথচ আমরা  অধিক মুনাফা অর্জনের হীন মানসিকতার পরিবর্তন করতে পারলে জনগণকে আরও বেশি তাদের প্রাপ্য সেবা দিতে পারতাম। কারণ, যেকোনো পেশারই একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে।

আর অর্থনৈতিক বিষয়টি কোনো পেশাতেই আমি অযৌক্তিক মনে করি না। তবে সেটা হতে হবে সেবা দাতা-গ্রহীতার আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, একজন ডিএইচএমএস অথবা বিএইচএমএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক দুই-তিন পদের ওষুধ দিয়ে একজন রোগী থেকে পাঁচ-সাত হাজার টাকা নিয়ে থাকেন। অন্যদিকে একজন এমবিবিএস অথবা প্রফেসর চিকিৎসক রোগীকে পাঁচ মিনিট সময় না দিয়েই এক-দেড় হাজার টাকা ফি নিয়ে থাকেন। এগুলো কোনো অবস্থাতেই  সমর্থন করি।

সুতরাং: আপনি এমন কোনো রোগীর কথা স্মরণ করতে পারেন, যার চিকিৎসা করতে গিয়ে আপনার মনে হয়েছে, তাকে বিনামূল্যেই চিকিৎসাসেবা দেওয়া উচিত?
ডা. মুহাম্মদ ইলিয়াছ:
হ্যাঁ, আমার এ মুহূর্তে একজন রোগীর কথা মনে পড়ছে, যাকে আমি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছিলাম। তার বয়স ৩২ বছর। তিনি টনসিলাইটিসে ভুগছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এন্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন করেছিলেন। রোগের কোনো উন্নতি হওয়ায় নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সরণাপন্ন হলে ওই চিকিৎসক তাকে তাৎক্ষণিক টনসিল অপারেশনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমার কাছে আসার পর আমি এ রোগীকে ডায়াগনোসিস করে হোমিও-বায়োকেমি ওষুধের ব্যবস্থা করেছিলাম। এতে তিনি অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং ২০১০ থেকে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভালো আছেন।

সুতরাং: আপনি কি আপনার অবস্থানে থেকে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করার ভূমিকা পালন করতে পারেন?
ডা. মুহাম্মদ ইলিয়াছ:
এটি একটি চমৎকার ও মূল্যবান প্রশ্ন। আমরা বর্তমান সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ পার করলেও আমাদের সমাজে এখনো অনেক অজ্ঞতা ও কুসংস্কার বিরাজ করছে দুঃখজনকভাবে। আমি মনে করি, চিকিৎসকসমাজই পারে রোগ-ব্যাধি বিষয়ে সমাজে যেসব কুসংস্কার ও অজ্ঞতা প্রচলিত আছে তা দূর করতে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, নারীর পুত্র অথবা কন্যা সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে নারীর বংশগত ও দৈহিক অবস্থাকে চিহ্নিত করা হয় এবং পুত্র সন্তান জন্মদানে অক্ষমতার জন্য অনেক পরিবারে এখনো নারীকে অপয়া ও অলক্ষুণে বলে। যা আদৌ ঠিক নয়। লিঙ্গ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ক্রোমোজমঘটিত বিষয়টি যে পুরুষ হরমোনের সঙ্গেই সম্পৃক্ত, এটা অনেকেই জানে না। এখানে একজন চিকিৎসক গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে মানুষের এ অজ্ঞতা দূর করতে পারেন অনায়াসে। এছাড়া এখনো মানুষ ডিসপেপসিয়া (বদহজম) এর জন্য বদনজর, সাইকোনিউরোসিস (একধরনের মানসিক রোগ)-এর জন্য জিন-ভূতকে দায়ী করে এসব কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। এক্ষেত্রেও একজন চিকিৎসক মানবদেহের ফিজিও-এনাটমিক্যাল গঠনপ্রণালী ও কর্মপদ্ধতি তুলে ধরার মাধ্যমে মানুষের এসব ভুল ভাঙতে সহায়তা করতে পারেন।

সুতরাং: মফস্বলে বসে চিকিৎসাসেবা দেওয়া নিয়ে আপনার কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া জন্মায় কি না?
ডা. মুহাম্মদ ইলিয়াছ
: মফস্বলে থেকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার মনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। বরং গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাঁসি ফোটানের মধ্যেই আমি পেশাগত সার্থকতা ও সফলতা খুঁজে পাই। আমি গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার থেকে আসা মানুষ হিসেবে বুঝতে পারি, তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন সামান্যই-যা আমরা সহজে পূরণ করতে পারি।

সুতরাং: আপনার পেশাগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ডা. মুহাম্মদ ইলিয়াছ:
পেশাগত জীবনে আমার পরিকল্পনা হলো চেম্বারের পাশাপাশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি রোগ নিরূপণী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে রোগীদের স্বল্পমূল্যে ও স্বল্প সময়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নীরিক্ষা সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা করা যাবে।

সুতরাং: আপনাকে ধন্যবাদ।
ডা. মুহাম্মদ ইলিয়াছ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ, ভালো থাকুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here