যে লেখা মানুষকে স্পর্শ করতে পারে না তা পণ্ডশ্রম ॥ জোবায়ের মিলন

0
263
views

জোবায়ের মিলন—লেখক ও সাংবাদিক। বার্তা প্রযোজক, বার্তা বিভাগ, এনটিভি। সাংবাদিকতা ও লেখালেখি নিয়েই তিনি কথা বলেছেন সুতরাংয়ের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাংবাদিক ও কথাশিল্পী সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

কেন সাংবাদিকতা পেশা বেছে নিলেন?
সাংবাদিক বলতে আমি যে পেশায় তা সরাসরি সাংবাদিকতা নয়। আমি সংবাদের পেছনের মানুষ। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় (টেলিভিশণ) সংবাদ তৈরি করার কাজটি মূলত আমি করি। এটিই এখন আমার জীবিকা নির্বাহের পথ। আর আমার পদবিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বলা হয়  ‘বার্তা প্রযোজক’ । এ কাজটির পাশাপাশি মনের খাদ্য যোগাতে আমি লেখালেখি করি।  সাংবাদিকতা পেশায় দিনে-রাতে মিলিয়ে কিছু সময় মিলিয়ে নেওয়া যায়। যেমন, আমার পেশায় রোস্টার ডিউটি পালন করতে হয়। আমার কখনো ভোরে, কখনো দুপুরে, কখনো বিকেলে, কখনো রাতে দায়িত্ব পালন করতে হয় ২৪ঘণ্টা সেবা বলে। ধরুন, যখন ভোরে দায়িত্ব পালন করি, তখন সাধারণত দুপুরের পর ফ্রি হয়ে যাই। এরপর বাকি সময়টুকু চাইলে আমি আমার মতো করে ব্যবহার করতে পারি। বিশেষ করে আমাদের পেশায় চাপ যেরকম আছে সেরকমভাবে মুক্তচিন্তারও সুযোগ আছে। আমরা গল্প করতে করতে কাজ করি। হাসতে হাসতে চাপ সামলে নেই। অন্যান্য পেশার মতো আমাদের কাজ থাকুক আর নাই থাকুক চেয়ারে আঠা লাগিয়ে বসে থাকতে হয় না। অফিসে বস্ বস্ মনোভাব নেই। সবাই বন্ধুর মতো টিম-ওয়ার্ক করি। ফলে কাজে ক্লান্তি আসে কম। যে কারণে আমরা কাজের পরেও চাইলে আরও কিছু কাজ করতে পারি। যেমন, আমি মুক্ত সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করি। আর এ কারণেই আমি এই পেশাটি বেছে নিয়েছি বা এই পেশায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।

আপনি একজন লেখক। সে হিসেবে সাংবাদিকতা পেশাটি কি সহায়ক?
এটি একপক্ষীয়ভাবে বলা যায় না। এমন অনেক লেখক আছেন যারা সাংবাদিক নন। সরকারি কর্মচারী বা কর্মকর্তা। আবার এমন লেখনও আছেন যারা পুরোদস্তুর কারখানা রিলেটেড পেশায় নিয়োজিত। আবার সাংবাদিকও আছেন। দেখুন, বড় বিষয় হচ্ছে ইচ্ছা শক্তি। আসলে আমি লিখতে চাই কি না, সেটি নির্ভর করে মনোগতির ওপর। পেশার ওপর নয়। পেশা হচ্ছে শরীরীয় খাদ্য জোগানের উপায়। লেখা হচ্ছে মনের খাবার। যিনি লিখতে চান তিনি যেকোনো পেশায় থেকেই লিখে যাচ্ছে বা যান। পৃথিবীর লেখকদের দিকে তাকালে এর উত্তর অনেকটা পাওয়া যাবে।

আপনার করা কোনো সংবাদ বা সাহিত্য জনকল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখতে পেরেছে?
সরাসরি আমি বলতে পারবো না—আমার সংবাদ বা সাহিত্য (প্রতিবেদন, ফিচার, কবিতা, গল্প) জনকল্যাণে ভূমিকা রেখেছে। তবে আমি জনগণ অর্থাৎ মানুষের জন্য লিখি। অনেকে বলেন, সাহিত্য বা সংবাদ নিজের জন্য করি। আমি সরাসরি বলতে চাই, আমি আমার লেখালেখি মানুষের জন্য করি। সময়ের ছায়া অঙ্কন করি। তাই আমি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখতে বেশি পছন্দ করি। আমার লেখাও তার স্বাক্ষর আছে। যখন লেখার বিষয় নির্বাচন করি, তখন চিন্তার ভেতর থাকে তা যেন কোনো না কোনোভাবে মানুষের উপকারে আসে। ফিডব্যাক পেলে বুঝি—তা হয়তো কারও মনকে ছুঁয়েছে অথবা কাজে লেগেছে। আর বিশ্বাস করি, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি লেখা মুখ্য বা গৌণভাবে মানুষকে স্পর্শ করতে পারে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তা আাসলে কোনো লেখাই না। পণ্ডশ্রম মাত্র।

আপনি সাংবাদিকতা করতে গিয়ে লেখক হয়েছেন না কি লেখালেখি করতে এসে সাংবাদিক হয়েছেন?
ওই যে আগেই বললাম, পেশা ও লেখা দুটি ভিন্ন জিনিস। কোনোটার জন্য আসলে কোনোটা ঠিক হয়নি। লেখালেখি করি ছোট বেলা থেকেই। আর পেশা নিয়েছি এই তো সেদিন। পড়াশোনা শেষ করে পেটের তাগিদে কাজ খুঁজেছি, বহু ঘাট ঘুরে ঘুরে অবশেষে এই পেশায় থিতু হয়েছি। তারপর মনে হয়েছে, আমার লেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই কাজটি উপযুক্ত কিংবা এই কাজ ও লেখা চালিয়ে যেতে আমি আরাম পাচ্ছি। এটা সত্য, আমি পড়াশোনায় থাকা অবস্থায়ই এ রকম একটি পেশায় জোগদান করতে আগ্রহী ছিলাম ও আমি আমাকে প্রস্তুত করেছি।

সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মধ্যে কেমন পার্থক্য অনুভূত হয় আপনার কাছে?
কোনো পার্থক্যই মনে হয় না। দুটোকেই আমার কাছে কাজ মনে হয়। আপনি যখন আপনার দ্বারা কৃত ক্রিয়াকে মনোযোগ সহকারে করবেন, তখন দেখবেন একটা গতি অনুভব করছেন। আপনি যখন আপনার কাজে আনন্দ পাবেন, তখন দেখবেন সে কাজটিতে কোনো ঘর্মক্লান্তি নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা করে যাচ্ছেন কিন্তু কোনো ক্লান্তি আসছে না। সেখান থেকে কোনো পার্থক্য দেখি না। আবার অন্যভাবে এই কথাটিকেই বলা যায়, আপনি যদি আপনার কাজকে স্বার্থান্বেষী দৃষ্টিতে না দেখে ত্যাগের দৃষ্টিতে দেখেন তখন সব কাজই সমান। আসলে আমরা যা করি, তার সবই  অন্যের জন্য, নিজের জন্য আসলে কী করি আমরা?

লেখালেখি ও সাংবাদিকতা দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ বা অলাভজনক। এই দুটি ক্ষেত্রে আপনার জীবন ধারনে কোনো প্রভাব ফেলে কি না?
এখানে আপনি ঝুঁকিপূর্ণ বলতে অর্থনৈতিক দিকটি বুঝিয়েছেন কি না জানি না, আমি তাই ভেবে নিলাম। যারা অর্থ উপার্জনের জন্য, লাভের জন্য সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকে পেশা হিসাবে নেয়, তাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে বলবো, এ কাজে না আসাই ভালো। কেননা এখানে কোনো মাখন নেই। তেলচিটচিটে জীবন হয় সাংবাদিক ও সাহিত্যিকের। প্রকৃত পক্ষে যে পেশাগুলো সেবামূলক, তার সবই অলাভজনক বা ঝুঁকিপূর্ণ। আরেক দিকে আমাদের কোনো পেশারই পূর্ব প্রস্তুতি নেই বা আমাদের সে বিষয়ে কাউন্সেলিং করা হয় না। আমরা বেশিরভাগই মনের বিরুদ্ধ পেশায় প্রবেশ করি, না যেনে না বুঝেই। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট আমাদের বাধ্য করে। আমরা এখানে দেখি, একজন বুয়েট পাস করা মানুষও ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ করছে আবার একজন হিসাববিজ্ঞানবিদও সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে যাচ্ছে জীবনের তাগিদে। এসব মুহূর্তগুলোতে কিছুই করার থাকে না। আপনি দেখবেন অনেক কম-সংখ্যক ছেলে-মেয়েই তাদের পছন্দের, স্বপ্নের পেশায় জড়িয়েছে। আমি শুনেছি, বিদেশের অনেক দেশে যেকোনো পেশাকে গ্রহণ করার আগে তাদের কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ থাকে। যেখান থেকে তারা ওই কাজটির সুবিধা, অসুবিধা, স্ট্র্যাগল সম্পর্কে জানতে পারে। এরপর তারা তা পেশা হিসেবে নেবে কি নেবে না, তার সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের এখানে কি এ সুযোগ আছে বলুন? আমি আমার পেশা গ্রহণের আগে বিস্তর সাংবাদিক ও সাহিত্যিকের জীবনী পাঠ করেছি এবং অনেক সময় তাদের জন্মভিটায় ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছি। অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি এ পেশার মানুষগুলোর জীবনধারণ পদ্ধতি কেমন, তারা কী পেয়েছেন, কী পাননি। সবদিক দেখেই আমি আমার পেশাকে গ্রহণ করেছি। তাই আমার মধ্যে কখনো কোনো আক্ষেপ আসে না। বরং আমি মনে করি এটাই আমি, এ রকমই আমি। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়—আমি-আপনি যেকোনো মানুষ যদি অন্যকে দেখে দেখে জীবনের কথা ভাবি, জীবনকে সাজানোর স্বপ্ন দেখি, তবে নিজের জীবনের বেলায় তা না পেলে আমরা অস্থির ও অসুখী হয়ে পড়ার প্রভূত আশঙ্কা থাকে। এই অস্থিরতা ও অসুখটি একটি জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে। এই যে দেখুন, ওমুক ডাক্তারের গাড়ি আছে, বাড়ি আছে! ওমুক সাংবাদিকের হাতি আছে, ঘোড়া আছে। এগুলোর পেছনে যদি আমরা ছুটি, তবে আসলে আমরা গাড়ি-বাড়ির দিকেই ছুটছি; আমরা আর পেশার প্রতি কিন্তু সৎ থাকছি না। অসতের পেছনে ঘোরা কখনোই জীবন নয়। ওটা কুকুর বেড়ালের জীবন।

লেখালেখি বা সাংবাদিকতায় পারিবারিক সাহযোগিতা কেমন মনে হয়?
আমার পরিবার আমাকে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করে থাকে। আমার মা আমাকে এখনো, যখন আমি লেখার টেবিলে থাকি, তিনি খাবার রেডি করে পাশে দিয়ে রাখেন। আমার বোন আমার হাতের বহুকাজ তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে সেরে দেন, যা থেকে উদ্বৃত্ত সময়ে আমি লেখায় মনোযোগ দিতে পারি। আমার স্ত্রী আমাকে তার ব্যক্তিগত সময় থেকেও সময় বাঁচিয়ে আমাকে দেয়। অনেক সময় রাত জেগে লিখতে থাকলে কখনো সে এসে ঘরের আলোটি নিভিয়ে দেয়নি। বরং বিছানায় শুয়েও সেলফোনে যখন কিছু লিখি, তখন বিরক্ত না হয়ে লেখা শেষে তা পাঠ করে শোনানোর ইচ্ছাপোষণ করে। এটি আমার জন্য বিরটা এক আশীর্বাদ। লেখক মাত্রই নয়, সৃষ্টিশীল বা অতিমাত্রায় কাজের পেছনে পরিবারের সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রযোজন। তা না হলে সে কাজের ফল ভালো হওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না। সাহিত্যিকের কথা বাদ দিন। একজন ব্যবসায়ী যিনি প্রতিষ্ঠিত, তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তার পরিশ্রমের পেছনে তার পরিবারের সহযোগিতা না থাকলে তার দ্বারা অগ্রসর হওয়া শুধু কঠিনই নয়, অত্যন্ত জটিল। আমি আমার পেশাগত কাজে এক অনুষ্ঠানে আঠাশজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর প্রোফাইল তৈরি করেছিলাম, সেখানে প্রতিজনের সংগ্রামের পেছনেই পরিবারের অবদানের কথা একবাক্যে শুনেছি।  একটি জাতীয় দৈনিকে মহিলা অঙ্গনের জন্য একুশজন নারী উদ্যোক্তার উঠে আসার বিশেষ রিপোর্ট লিখতে গিয়ে তাদের কাছে শুনেছি তাদের কাজের পেছনে তাদের পরিবার কিভাবে তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে দিয়েছে। আর একজন সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিকের বেলায় তো পরিবারের সহযোগিতার বিকল্প ভাবাই যায় না।

ভালো কোনো সুযোগ পেলে (সরকারি বা বেসরকারি) কি এ পেশায় থাকবেন?
আমি আগের কোনো একটি প্রশ্নে বলেছি—পেশা এবং লেখা দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট। একটির জন্য আরেকটি নয়। যে লিখতে চায়, সে যেকোনো পেশায় থেকেই লিখতে পারে। লেখার আনন্দে যাকে পেয়েছে তাকে আগুনে ফেলে দিলেও সে লিখবে। পানিতে ফেলে দিলেও সে লিখবে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে গার্মেন্টস্ সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানে যখন চাকরি করেছি, যখন নয়টা-পাঁচটা অফিস করেছি, তখনো লিখেছি। সে চাকরিটি ছেড়ে দিয়ে যখন স্কুল শিক্ষকতা করেছি, তখনো লিখেছি। সে চাকরি থেকে বের হয়ে যখন মুক্ত নির্মাতা হিসেবে কাজ করেছি, তখনো লিখেছি। যখন দৈনিকে প্রদায়ক হিসেবে কাজ করেছি তখনো লিখেছি। যখন সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করছি, তখনো লিখছি। অর্থ উপার্জনের জন্য এরচেয়ে ভালো কোনো সুযোগ যদি আসে, সবদিক বিবেচনা করে যদি আমার কাছে মনে হয় সুবিধাজনক, তবে অবশ্যই তা গ্রহণ করবো।

যারা সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?
আগের কথাগুলোয়ই মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তরটি বলা হয়ে গেছে। তবু বলছি, যারা যখন যে কাজটি করতে চান, তারা যেন সে কাজটির প্রতি অসৎ আর ফাঁকিবাজ না হন। যদি কাজ করতেই হয় মনপ্রাণ দিয়ে সে কাজটি করুণ। দুই নৌকায় পা না দিয়ে প্রতিটি কাজকেই একনৌকা ভাবুন। প্রচুর পড়াশোনা করুন। প্রচুর জীবনি পড়ুন। জীবনকে পাঠ করুন। নিজের সঙ্গে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিন। নিজেকে চিনুন। নিজেকে বুঝতে পারলে পৃথিবীতে আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকতে কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না। এই পেশা দুটি আরামের পেশা নয়। সুখের পেশা নয়। ভালো থাকার পেশা নয়। একলা থাকার পেশা এই দুটি পেশা। একলা থাকতে যারা ভীতু নন তারা চালিয়ে যেতে পারেন। এখানে অর্থ নেই, সহায়-সম্পদ নেই। যদি পূর্বপ্রস্তুতি থাকে, যদি এ পেশার জীবন সম্পর্কে ধারণা থাকে, তবে এ পেশায় মনের সুখ আছে। অপার সুখ আছে। সব বুঝে-শুনে বিবেচনা করে যারা আসতে চান, তারা আসতে পারেন। এখানে নন্দিত জীবনের আনন্দ আছে।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
আপনাকেও ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here