সাংবাদিককে সাহসী হতে হবে ॥ মেহেদী শামীম

0
198
views

মেহেদী শামীম—পেশায় সাংবাদিক। এছাড়া লেখালেখি করেন বিভিন্ন বিষয়ে। তার ‘বোধের ব্রেকিং নিউজ’ নামে কবিতার বই ও ‘তল্পিতল্পার গল্প’ নামে গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকে পেশা এবং নেশা হিসেবেই বেছে নিয়েছেন তিনি। এসব নিয়েই কথা বলেছেন সুতরাংয়ের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাংবাদিক ও কথাশিল্পী সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনি কেন সাংবাদিকতা পেশা বেছে নিলেন?
মেহেদী শামীম: কঠিন প্রশ্ন। মানুষ তার চারপাশের মানুষ দ্বারা প্রভাবিত হয়, আমিও এর ব্যতিক্রম নই। তবে একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল শুরু থেকেই। অন্যান্য পেশার তুলনায় সাংবাদিকতা একটা বহুমুখী পেশা। এখানে কাজ করতে হলে বহুমুখী জ্ঞানের দরকার হয়। প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। ছোট বেলা থেকেই আমি একজন কৌতূহলী মানুষ। এই কৌতূহলী মন-ই আমাকে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। আমার প্রথম বইয়ের নাম ‘বোধের ব্রেকিং নিউজ’। এটা থেকেও কিছুটা বুঝতে পারবেন, আমি একজন সংবেদনশীল মানুষ। আর একজন সংবেদনশীল মানুষ হয় রাজনীতি করবে, সাহিত্য করবে অথবা সাংবাদিকতা করবে। আমি বেছে নিয়েছিলাম সাহিত্য ও সাংবাদিকতা।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনি একজন লেখক। সে হিসেবে সাংবাদিকতা পেশা কি লেখকের জন্য সহায়ক না প্রতিবন্ধক?
মেহেদী শামীম: বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশাটা একটু জটিল। এখানে একজন সাংবাদিকের নানান কাজ করতে হয়। পেশাদারিত্ব সাংবাদিকতার পরিবেশটা এখনো বাংলাদেশে ওইভাবে গড়ে ওঠেনি। আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলো অথবা মিডিয়াগুলো মুনাফামুখী অথবা ব্যবসায়ী মনোভাবের না। যার ফলে এখানে চাকরি করতে আসা মানুষগুলো নানা ধরনের ক্রাইসিসের মুখোমুখি হয়। নানান ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা চলে। ফলে চাকরির নিরাপত্তা কম থাকে, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা থাকে। যদিও ক্রাইসিস মানুষকে সাহিত্য রচনায় সাহায্য করে আবার অনেক ক্ষেত্রে পতনের দিকেও নিয়ে যায়। আমি বলবো সহায়ক ও প্রতিবন্ধক এই দুটি শব্দ সমানভাবে প্রভাবিত করে সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য, এই দুটির ক্ষেত্রে। তবে এটাও সত্য বাংলাদেশে সাহিত্য এককভাবে একটি পেশা হিসেবে এখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনার করা কোনো সংবাদ বা সাহিত্য জনকল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখতে পেরেছে?
মেহেদী শামীম: এভাবে নিজেকে বিচার করে বলতে পারবো না। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি, নানান সময়ে নানান বিষয় নিয়ে লিখেছি। সাংবাদিকতার শুরু দিকে আমি একটা ১ কোটির টাকার মানহানির মিথ্যা মামলা মুখোমুখি হই সত্য প্রকাশের জন্য। হয়রানির শিকার হয়েও থেমে থাকিনি। কলমযুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছি। সেই যুদ্ধে আমি জয়ী হই। সাংবাদিকতা যতটা জনকল্যাণমুখী অতটা সাহিত্যকে আমি জনকল্যাণমুখী বলে মানি না। সাহিত্য কখনো কখনো নিছক আনন্দ উৎপাদনের জন্যও হতে পারে।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনি সাংবাদিকতা করতে গিয়ে লেখক হলেন, না কি লেখালেখি করতে এসে সাংবাদিক হয়েছেন?
মেহেদী শামীম: অবশ্যই লেখালিখি। আর লেখা প্রকাশের জন্য সংবাদপত্র অফিসে দৌড়াদৌড়ি। এই দৌড়াদৌড়ির কোন ফাঁকে যে সাংবাদিক হয়ে গেলাম, ঠিক মনে নেই। আমার মনে হয় সবার ক্ষেত্রে না হলেও অধিকাংশ মানুষ সাহিত্য থেকেই সাংবাদিকতায় এসেছে। এই দুটি পেশার মধ্যে এক ধরনের মেলবন্ধন রয়েছে। তবে আমার মনে হয় ফিচার অথবা রিপোর্ট লেখার সঙ্গে সাহিত্য লেখার কোনো সম্পর্ক নেই বরং প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তারপরেও মানুষ লেখালিখির মধ্যে থাকার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোকে বেছে নেয়।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনার কাছে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মধ্যে কেমন পার্থক্য অনুভূত হয়?
মেহেদী শামীম: বিস্তর পার্থক্য। দুটা দুইমুখী বিষয়। সাংবাদিকতা সত্য ঘটনামুখী বিষয় নিয়ে কাজ করে অন্য দিকে সাহিত্য হলো কল্পনামুখী বিষয় নিয়ে কাজ করে। একজন সাংবাদিক কোন ঘটনাকে হুবহু তুলে ধরে পাঠকের কাছে কিন্তু সাহিত্যিক কখনো কোনো বাস্তব ঘটনা হুবহু তুলে ধরে না। তারা একটি কল্পনামুখর প্রতিবেশ তৈরি করে। সাহিত্যের রস দেয়। দুটি আলাদা বিষয়। কখনো কখনো সাহিত্য ও সাংবাদিকের উদ্দেশ্য মিলে যায় কিন্তু কাজটা ভিন্ন-ই থেকে যায়।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: লেখালেখি ও সাংবাদিকতা দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ। এই দুটি ক্ষেত্র আপনার জীবনধারণে কোনো প্রভাব ফেলে কি না?
মেহেদী শামীম: সত্যি বলতে সব পেশাতেই ঝুঁকি রয়েছে। কোনটাতে একটু বেশি কোনটাতে কম। তবে একটি দেশের সাংবাদিকতা ও লেখালেখি পেশার ঝুঁকি দিয়ে অন্যান্য পেশার ঝুঁকি পরিমাপ করা যায়। যেই দেশের সাংবাদিক ও লেখক ঝুঁকিমুক্ত থাকে, সেখানে অন্যান্য পেশার মানুষরাও ঝুঁকিমুক্ত থাকে। যদি বলা হয় আমার জীবন কতটা ঝুঁকির প্রভাব মুক্ত তবে দ্বিধায় পড়ে যাবো। কারণ ঝুঁকি মানুষের জীবন হঠৎ করে আসে। হয়তো যেকোনো সময়ে ঝুঁকির মুখোমুখি হয়ে যেতেও পারি।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় পারিবারিক সহযোগিতা কেমন মনে হয়?
মেহেদী শামীম: এককথায় অনেক কম। পরিবার থেকে একটা স্থায়ী চাকরির দিকে যাওয়ার একটা চাপ থাকে। একটা প্রচলিত নিয়ম একটা সময় ছিল সাংবাদিকদের কাছে মেয়ে বিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তবে ইদানিং এই প্রচলিত নিয়মটা পাল্টে গেছে। কোনো কোনো পরিবার সহযোগিতা করছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অসযোগিতাই দেখা যায়।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: অন্য কোনো সুযোগ পেলে (সরকারি বা বেসরকারি) কি এ পেশায় থাকবেন?
মেহেদী শামীম: আমার আসলে চাকরি করার ইচ্ছাটা কখনোই ছিল না। আমি সবসময়ই ব্যবসা করতে চেয়েছি। হয়তো কোনো খাবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করতাম। কিন্তু আমার মধ্যে সবসময়ই ছিল, যেটা আমি সিনেমা নির্মাণ করবো। সিনেমা পরিচালনার বিষয়টা আমাকে অনেক বেশি টানে। সুযোগ পেলে এখনো আমি সিনেমা বানাইতেই চাইবো। আমার স্বপ্ন একটা সিনেমা নির্মাণ করা।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: যারা সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করতে চান, তাদের উদ্দেশে কী বলবেন?
মেহেদী শামীম: যারা সাংবাদিকতা অথবা লেখালেখি করতে চান, তাদের প্রথমেই বলবো প্রচুর পড়তে হবে। সবার আগে নিজের মধ্যে একটা নিরেপক্ষ বোধ তৈরি করতে হবে। সাহসী হতে হবে। কারণ ‘কবিরা কাপুরুষ হলে পৃথিবীতে নামে অন্ধকার’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here