অপসাংবাদিকতা রোধে যোগ্যদের আসতে হবে ॥  রনি রেজা

0
224
views

রনি রেজা পেশায় সাংবাদিক। এছাড়া লেখালেখি করেন বিভিন্ন বিষয়ে। সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকে পেশা ও নেশা হিসেবেই বেছে নিয়েছেন তিনি। এসব নিয়েই কথা বলেছেন তিনি। সুতরাংয়ের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাংবাদিক ও কথাশিল্পী সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনি কেন সাংবাদিকতা পেশা বেছে নিলেন?
রনি রেজা: সাংবাদিকতায় আসা অনেকটা আকস্মিক বলা যায়। বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল যেন বড় হয়ে জজ-ব্যারিস্টার কিছু হই। আমার তাতে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। আবার অনাগ্রহ ছিল সেটাও বলা যায় না। বাকপটু স্বভাবের হলেও বড় হয়ে কী হবো, এমন প্রশ্নে খেই হারিয়ে ফেলতাম বরাবর। এখানে প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে কি আমার কোনো স্বপ্ন ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল। স্বপ্ন ছিল, প্রজাপতি হবো। হয়েছিও। খুব সহজেই হয়েছি। সৌভাগ্য বলুন আর দুর্ভাগ্য বলুন, আমার জন্ম উদারপন্থী এক পরিবারে। পারিবারিকভাবেই আমি স্বাধীন। কখনো কোনো প্রতিবন্ধকতা পোহাতে হয়নি। যখন যা ইচ্ছে হয়েছে করতে পেরেছি নির্দ্বিধায়। কখনো কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। ফলে সহজেই উচ্চ মাধ্যমিক শেষে বাবা-মায়ের স্বপ্নকে পাশ কাটিয়ে ভর্তি হলাম অনার্সে। আর লেখালেখির রাস্তা ধরে ঢুকে পড়লাম সাংবাদিকতায়। একটু বিস্তারিত বলি—আমি তখন ফরিদপুরে অনার্স করছি। একটি কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে ও টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতাম আর লেখালেখির ঝোঁক থেকে সেখানকার স্থানীয় একটি পত্রিকায় ফিচার লিখতাম। খুব ব্যস্ততায় সময় পার হতো। এরমধ্যেও সময় করে ফিচারগুলো কাগজে লিখে অফিসে গিয়ে দিয়ে আসতে হতো। নানা জটিলতায় ফিচারগুলো নিয়মিত প্রকাশ হতো না। মাঝে-মধ্যে খোঁজ নিতে যেতাম। এমনই এক সন্ধ্যায় পত্রিকাটির প্রকাশক ও সম্পাদকের সঙ্গে দেখা। সালাম দিতেই জানতে চাইলেন আমার পরিচয়। বললাম, আমি আপনার পত্রিকায় ফিচার লিখি। নিজের নামও বললাম। তিনি আমাকে তার রুমে ডেকে নিলেন। আমার লেখা পড়েন জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, নিয়মিত লিখি না কেন? এমন দীর্ঘ আলাপের পর প্রস্তাব রাখলেন যেন নিয়মিত অফিস করি। এজন্য কিছু সম্মানীও দিবেন। রাজি হয়ে গেলাম। বুঝতেই পারছেন, স্থানীয় পত্রিকা। নির্দিষ্ট বিভাগে আটকে থাকার সুযোগ নেই। ফিচার লেখার পাশাপাশি নিউজ করা, এডিট করা, সাহিত্যপাতা সম্পাদনা; সবই করতে হতো। এক সময়ে জীবনের সঙ্গেই জড়িয়ে গেলো পেশাটি।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনি একজন লেখক সে হিসেবে সাংবাদিকতা পেশা কি লেখকের জন্য সহায়ক না প্রতিবন্ধক?
রনি রেজা: প্রথম কথায় এর উত্তর সহায়কই বলবো। সহায়ক বলেই অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিক সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। কিন্তু অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না। শুধুই সাংবাদিক হয়ে যান। চোখের সামনেই এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে। যা আপনাদেরও নিশ্চয়ই জানা। এর অবশ্য কারণও আছে। সাংবাদিকতায় অন্য পেশার তুলনায় ব্যস্ত থাকতে হয় একটু বেশি। রাত করে বাসায় ফেরা, তথ্য সংগ্রহের জন্য দৌঁড়-ঝাপ। সব মিলিয়ে পড়া-লেখার খুব বেশি সময় পাওয়া যায় না। আর লিখতে হলে তো পড়ার কোনো বিপল্প নেই। এছাড়া সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত পেশার প্রয়োজনে লেখাজোখার মধ্যেই থাকেন। হোক সেটা সংবাদ বা ফিচার। ফলে তিনি যে ধীরে ধীরে মূল লেখা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন তা বুঝতেই পারেন না। এসব জায়গায় একটু সচেতন থাকতে পারলে সহায়কই। আর লেখকদের জন্য এটা কঠিন কিছুও নয়। একজন লেখকের তো সব ক্ষেত্রেই সচেতন থাকা জরুরি।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনার করা কোনো সংবাদ বা সাহিত্য জনকল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখতে পেরেছে?
রনি রেজা: ফরিদপুরের একজন বৃদ্ধ ডোমের দুর্দিনের চিত্র তুলে ধরে একটা ফিচার করেছিলাম। তার থাকার তেমন জায়গা ছিল না। ঠিকমতো খাবারও পেতেন না। শিরোনাম দিয়েছিলাম ‘সহস্রাধিক লাশ কেটে ন্যাবাই এখন জীবন্ত লাশ।’ ফিচারটি পড়ার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এটা ছিল আমার সাংবাদিকতা শুরুর দিকের প্রাপ্তি। আর গত কয়েকদিন আগে একটা ফিচার করেছিলাম জামালপুর ঘুরে এসে। সেখানের একজন তরুণ বিজ্ঞানী পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে তেল, গ্যাস ও প্রিন্টারের কালি তৈরির যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। নাম তৌহিদুল ইসলাম তাপস। তিনি জাতীয় পরিবেশ পদক ২০১৮-এর জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ক্যাটাগরিতে মনোনীত হয়েছেন। যা ১৮ জুলাই ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৮ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তুলে দিবেন। এছাড়াও উল্লেখ করার মতো কয়েকটা ঘটনা আছে। সত্যিকার অর্থে এসব প্রাপ্তিই এ পেশায় টিকে থাকতে শক্তি যোগায়। অনুপ্রাণিত হই।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনি সাংবাদিকতা করতে গিয়ে লেখক হলেন, না কি লেখালেখি করতে এসে সাংবাদিক হয়েছেন?
রনি রেজা: নিশ্চয় লক্ষ করেছেন; প্রথম প্রশ্নের উত্তরেই আমি উল্লেখ করেছি, লেখালেখির রাস্তা ধরে ঢুকে পড়েছি সাংবাদিকতায়।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আপনার কাছে সাহিত্য সাংবাদিকতার মধ্যে কেমন পার্থক্য অনুভূত হয়?
রনি রেজা: সাহিত্য সাধারণ কাজ নয়। সাহিত্য মনের তাগাদা থেকে আসে। এটি হৃদয়ের খোরাক। বেঁচে থাকার অবলম্বন। সাহিত্যের জন্য নিজেকে নির্মাণ করতে হয়। প্রতিনিয়ত বদলাতে হয়। পোড়াতে হয়। আর সাংবাদিকতা একটি পেশা। হ্যাঁ, এখানেও মনের তাগাদা থাকতে হয়। এটার জন্যও নিজেকে কিছুটা বদলাতে হয়। তবে সাহিত্যের মতো অতটা নয়। যে কোনো পেশাই আপনি ইচ্ছে করলেই ছেড়ে দিতে পারেন। অথবা পেশা আপনাকে একসময় ছেড়ে দেবে। সাহিত্য কিন্তু মোটেও এমন নয়। সাহিত্য হচ্ছে এক কঠিন প্রেমের নাম। এ প্রেমে একবার জড়ালে বের হওয়াও অতটা সহজ নয়। আবার সাহিত্যও আপনাকে ছাড়বে না। একবার প্রেম হয়ে গেলে আপনি সুখ, দুঃখ, দারিদ্র্য, অট্টালিকা; যার মধ্যেই থাকুন- সাহিত্য ঢুকে যাবে। সাহিত্যের আমার দৃষ্টিতে, সাহিত্যের বিশালতাই এর সৌন্দর্য।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: লেখালেখি সাংবাদিকতা দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ এই দুটি ক্ষেত্র আপনার জীবনধারণে কোনো প্রভাব ফেলে কি?
রনি রেজা: কোথায় নেই ঝুঁকি? প্রতিটি স্তরেই ঝুঁকি রয়েছে। ধরন ভিন্ন। হয়ত অন্য জায়গার তুলনায় এ দুটো জায়গায় ঝুঁকি বেশি। অনিশ্চয়তা বেশি। তবে সুবিধাও কি বেশি নয়? আত্মতৃপ্তির পরিমাপ আপনি কী দিয়ে করবেন? এ আত্মতৃপ্ত সাহিত্যে পাওয়া যায়। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কিছু বেদনা আছে। সেটির জন্যও কিছু সাংবাদিকই দায়ী। এ সাংবাদিকতার ভেতরকার যে সমস্যাগুলো আছে এগুলো সমাধান হলে আর কোনো বেদনা থাকবে না। তবে ঝুঁকির বিষয়ে আমার মোটেও আপত্তি নেই। সংকোচ নেই।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: লেখালেখি সাংবাদিকতায় পারিবারিক সহযোগিতা কেমন মনে হয়?
রনি রেজা: আগেই বলেছি, আমি উদারপন্থী পরিবারের সন্তান। কখনো কোনো প্রতিবন্ধকতা সেভাবে পোহাতে হয়নি। সব বিষয়েই আমার পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সব সময়। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও। শুধু ব্যতিক্রম সাংবাদিকতা। এখানে বাবা-মায়ের অসন্তোষ স্পষ্ট। যদিও সেভাবে বিরোধিতা করেননি কখনো।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: অন্য কোনো সুযোগ পেলে (সরকারি বা বেসরকারি) কি পেশায় থাকবেন?
রনি রেজা: হয়তো অবাক হবেন, আজ অবধি আমি কোনো সরকারি চাকরির আবেদন করিনি। সাংবাদিকতার প্রতি আলাদা ভালোবাসা আছে বলেই হয়তো। তবে মাঝে মধ্যে মনে হয় ছেড়ে দেই। সেটা অনুরাগ থেকে। পাওয়া না পাওয়ার বিষয়ে আমি কখনোই বিচলিত নই। কোনো ক্ষেত্রেই না। তবে অসঙ্গতি আমি একদম সহ্য করতে পারি না। সাংবাদিকতার যে সমস্যাগুলো সবার জানা। যে অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকির কথা বলা হয় আমি ওসব ভয় করি না। তবে আমার লজ্জা লাগে, বর্তমান গণমাধ্যমের অসঙ্গতিগুলো। হলুদ সাংবাদিকতা, অসাংবাদিকতা আমাকে পীড়া দেয়। এসব কারণেই মাঝে মধ্যে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিতে মন চায়। আবার ভাবি, এভাবে পলায়নের চেয়ে সংশোধনের চেষ্টাও তো করা যেতে পারে। নিজের জায়গা থেকে যতটুকু পারা যায়। লক্ষ্য করেছেন কিনা জানি না, বেশ কয়েক মাস ধরে একটি দৈনিকে গণমাধ্যমের নানা সংকট ও সমাধানের উপায় নিয়ে নিয়মিত লিখছি। জানি না এতে কতটুকু কাজ হবে। হতে পারে একদিন সত্যিই পেশাটি ছেড়ে দিতে হবে। তবে জানিয়ে রাখি, তা হবে অন্য ভালো কোনো চাকরির লোভে নয়; শুধুই অভিমান থেকে।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: যারা সাংবাদিকতা লেখালেখি করতে চান, তাদের উদ্দেশে কী বলবেন?
রনি রেজা: লেখালেখির জায়গায় চোখ বন্ধ করে উৎসাহী করবো। চারপাশে প্রতিনিয়ত অনেক মন্দ কাজের চর্চা হচ্ছে। ইচ্ছে করলেই হাজারটা মন্দ কাজ করা যায়। কিন্তু ভালো কাজ করতে অনেক বাধা। শুধু ভালো কাজ করতে নয়; মন্দ কাজ থেকে ফিরে থাকাটাও কষ্টসাধ্য। আর সাহিত্য চর্চা অনায়াসেই অনেক মন্দ কাজ থেকে ফেরাবে। লেখালেখি বোধের জায়গা প্রসারিত করে। ইচ্ছে করলেই একজন লেখক খারাপ কাজ করতে পারেন না। তাছাড়া লেখালেখি করতে হলে প্রচুর পড়তে হবে, এরপর ভাবনাজুড়ে সেগুলো খেলা করবে। লিখতে সময় লাগবে। সব মিলিয়ে দৈনন্দিন কাজের বাইরে যেটুকু সময় থাকে তা পড়া-লেখা-ভাবনার মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকবে। এসময়গুলো অন্য কোনো কিছুই করা সম্ভব হবে না। মন্দ কাজ তো দূরের কথা। আর সাংবাদিকতার বিষয়টি ভিন্ন। আগেই বলেছি এটা একটি পেশা। পেশা হিসেবে এখানের ভালো-মন্দ বুঝে যদি কেউ আসতে চায় অনুৎসাহিত করবো না। তবে অনুরোধ থাকবে কেউ যেন ঝোঁকের বসে না আসে। এ পথ মোটেও মসৃণ নয়। খুব সাবধানে চলতে হবে। একইসঙ্গে নতুনদের আসাও জরুরি। যে সমস্যাগুলো আছে এগুলো সমাধানে। হলুদ সাংবাদিকতা-অপসাংবাদিকতা রোধে যোগ্যদের আসতে হবে। যারা এ চ্যালেঞ্জ নিতে পারবে তাদের সাধুবাদ জানাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here