অটোগ্রাফ ॥ আহমেদ শরীফ শুভ

0
555
views

দু’বার ফোন বেজেছে। কিন্তু একবারও ধরতে পারিনি। প্রথমবারে হিথ্রোর চেক ইন কাউন্টারে। দ্বিতীয়বার ইমিগ্রেশনের লাইনে। তমালিকার ফোন। হাতে সময় না থাকায় দৌড়ে প্লেনে উঠতে হয়েছে। ভাবলাম, ঢাকায় নেমে ফোন ব্যাক করবো। শত ব্যস্ততার মাঝেও ফোন করেছিলাম। ফোনে যোগাযোগ করে ওকে একবার দেখে আসার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ও ফোন ধরেনি, কিংবা ধরতে পারেনি। আমারও দেখা করা হয়নি।

তমালিকার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়েছে বছর খানিক আগে। ক্যান্সারের রোগিকে কিভাবে কাউন্সেলিং করতে হয় একজন চিকিৎসক হিসেবে তা আমার জানা আছে। কিন্ত তমালিকা আমার রোগী নয়, ছোটবেলার বন্ধু। পেশাদারি কাউন্সেলিং আপন মানুষের উপর খাটানো যায় না। খবরটা পেয়ে বন্ধু হিসেবেই ফোন করেছিলাম। ও কাঁদেনি। শুধু বলেছিল, ‘দেশে এলে দেখা করিস কিন্তু’।

ওর সাথে বন্ধুত্ব স্কুল জীবন থেকে। স্কুল ছাড়ার সাথে বন্ধুত্বেরও সাময়িক ছাড়াছাড়ি। ‘গেলেম কে কোথায়…’। মোবাইল ফোন আর ফেইসবুকের যুগে আমাদের বন্ধুত্ব আবারো ফিরে এলো। সদরুলই সবাইকে খুঁজে বের করলো একে একে। বহুদিন পর কখনো মুখোমুখি আবার কখনো ভার্চুয়ালি সদরুল, তমালিকা, পুষ্প, শাওন, নুসরাত, রাহেলা, মাসুদ, রাশেদ, আখতার, নিরঞ্জন সহ অনেকের সাথেই নতুন করে আড্ডা শুরু হলো। এই সব আড্ডার ফাঁকে মধ্যে স্কুলের ‘তুমি’ তমালিকা আমাদের অনেকের ‘তুই’ হয়ে উঠলো। কয়েক মাস আগে রমনা রেঁস্তোরায় তেমন এক আড্ডায় শেষ দেখা ওর সাথে। কান্সারাক্রান্ত অসুস্থ শরীর নিয়েই এসে হাজির। ‘তোরা নাচবি গাইবি আড্ডা দিবি আমাকে ফেলে, এটা ভেবেছিস?’ সত্যি জমেছিল সেই আড্ডা। আমরা জানতাম তমালিকার সাথে আমাদের আবার দেখা নাও হতে পারে। আখতার আর পুষ্প গাইলো। পঞ্চাশ পেরুনো আমরা সবাই তালে বেতালে নাচলাম। তমালিকার গোবেচারা বরও আমাদের সাথে তাল মেলালেন।

দেশে না থাকলেও তমালিকার সাথে কথা হতো মাঝে মধ্যেই। ও ই ফোন করে খোঁজ খবর নিত, অতীতের স্মৃতিচারণ করতো, ঢাকার বন্ধুদের হালচাল জানাতো। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর আমিই করতাম বেশি। শরীরের অবস্থা জানতে চাইতাম। সাহস দিতাম। পুরোনো দিনের মজাদার কোন গল্প বলে হাসাতে চাইতাম। ও হাসতো আগের মতোই। যেদিন সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এলো কেমোথেরাপি শেষে সেদিনও কথা হয়েছে। বলেছি, সহসাই দেখা হবে।

কিন্তু দেখা হয়নি। আমষ্টারডাম থেকে অকল্যান্ডের পথে ট্রাঞ্জিটে দুবাই এয়ারপোর্টে কফি খাচ্ছি। এমন সময় সদরুলের এসএমএসে তমালিকার অপার্থিব জগতে যাত্রার কথা জানতে পারলাম। মাথায় একটাই প্রশ্ন এলো, সেদিন ও আমাকে কি বলতে চেয়েছিল? বিদায়ের ফোন কল?

বহুদিন আগে তমালিকা আমাকে একটা ডায়েরি গিফট করেছিল। সে ডায়েরিতে  অদৃশ্য কালিতে অটোগ্রাফ দেয়া – ‘রাহুল, আমাকে ভুলে যাসনে যেন’।

সদরুলের পাঠানো এসএমএস পড়ে তমালিকার ফোন কল আমার কানে বেজেই চললো, ‘আমাকে ভুলে যাসনে রাহুল’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here