অভাব ॥ কিশোর কারুণিক

0
38
views

বাবার বুকের ব্যথায় খুব বেশি হয়ে গিয়েছিল। বাবাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল তাপস। ডাক্তার তার ফিস ছাড়া রোগী দেখবেন না। বড় ডাক্তার। ডাক্তার ফিস ৫০০টাকা। তাপস বুঝতে পারলো না এখন কী করবে। ওর কাছে কে যেন বলল সরকারী হসপিটালে নিয়ে যাও। রোগীকে আবার ভ্যানে তুলে সরকারী হসপিটালের দিকে ভ্যান ছুটছে হঠাৎ বাবার মুখ ঘুরে পড়লো। তাপস বুঝতে পারলো বাবা মারা গেলেন। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো তাপস। আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো।

তাপসদের সংসারে বাবাই ছিল একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। তাপসের বয়স ১৫ বছর। পাড়া প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় মরদেহ গঙ্গা দেওয়ার ব্যবস্থা হলো। ধর্মীয় বিধান মতো কাঁচা গলায় দিয়েছে তাপস। সংসারে বোন আর মা। ঘরেতে একমুঠো চাল নেই। এই সময় আতপ চালের ভাত খেতে হয়, ধর্মীয় কিছু বিধান মানতে হয়। পাড়া প্রতিবেশীদের কথা মতো বাবার শ্রাদ্ধক্রিয়ার কাজ পনের দিন করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

প্রথম কয়েকদিন পাড়া প্রতিবেশীরা আতপ চাল আলু পটল দিয়ে যায়। ওই দিয়েই চলে যায় পাঁচদিন। আজ সকাল থেকে পথের দিকে চেয়ে আছে কেউ যেন আসে। পৌষ মাস। সকালে স্নান করে গায়েই পরনের ধূতিটা শুকানো হয়ে গেল। দুপুর ২ট বেঁজে গেল। কিন্তু কারোর আসার কোন খোঁজ নেয়। ক্ষিধেতে ছটপট করছে ছোট বোন, ওর বোধ হয় খুব ক্ষিধে লেগেছে। এভাবেই চলে গেল দিনটা। পরের দিন আর শরীর চলে না। উঠানে বড়ই গাছ। তাপস স্নান করে গাছ ঝাকি দিলো, বেশ কিছু কুলফল পড়লো। ঐ দিয়েই ঐ দিনটা চললো। ঘরের পাশে কলা গাছের ঝাড়, গাছে কলা ধরেছে কিন্তু এখনো পক্ত হয় নি। কী আর করা কলার কান কেটে কলা সিদ্ধ করে খেয়ে ১৪দিন পার হলো। তবু কারো কাছে কিছু চায়নি তাপস। ওর খুব লজ্জা। পাশের বাড়ির একজন এসে বললো। তোর বাপের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান না করলে তোর বাপের নরকেউ ঠায় হবে না।

তাপসের মা ওদের অভাবের কথা বললো। লোকটি বুদ্ধি দিলো মানুষের কাছে সাহার্য চায়তে। তাপস প্রথমে রাজি ছিল না। কিন্তু বাবা নরকেউ ঠাই হবে না ভয়ে লোকটির কথা মতো মানুষের কাছে বাজারে দোকানদার দের কাছে সাহার্য চাইলো।

মানুষজন তাদের সাধ্যমত সাহার্য করলো। ঠাকুর মশায় বড় একটি ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে বললে, ফর্দের একটিও জিনিস যেন বাকি না থাকে তাহলে তোমার বাবার গতি হবে না। তাপস ফর্দের লেখা মতো সব জিনিসসদয় কিনলো। দশ কেজি সিদ্ধ চাল, পাঁচ কেজি আতপ চাল, আলু, পঠল, ধূতি গামছা ইত্যাদি ।

আজ শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। আজ ৯/১০ দিন অন্ন পেটে পড়েনি, ও ভেবেছে ভালোই হলো যে সব জিনিস কিনা হলো ও দিয়েই ওদের সংসার বেশ কিছুদিন চলে যাবে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে গেল। হাতে আর কোন টাকা নেই। বোনটা সকাল থেকে কাঁদছে, মা’র মুখে কোন কথা নেই। ঠাকুর মশায়ের আর্থিক অবস্থা ভালো। ঠাকুর মশায় কলাপাতা করে কী যেন তাপসের হাতে দিয়ে বলল, নদীতে দিয়ে স্নান করে আসো। তাপস ঠাকুর মশায়ের কথা মতো তা করতে চললো। সঙ্গে ছোট বোন গেলো।
বোন বললো, দাদা খুব ক্ষিধে লেগেছে!
চল বাড়ি গিয়ে রান্না করব।
বাড়ি ফিরে এসে দেথে ঠাকুর মশায় চাল ডাল পটল সামগ্রী তার পুটলায় বেঁধে বসে আছে। তাপস বললো, কাকাবাবু আপনি সব চাল নিয়ে যাচ্ছেন?
হ্যাঁ, এগুলো ব্রাহ্মণের পাওনা। আমার দক্ষিণা দাও।
দক্ষিণা কোথায় পাব?
আমার দক্ষিণা না দিলে তোর বাপ নরকগামী হবে।
কী বলছেন কাকাবাবু?

ঘরে ঢুকে কিছু কয়েন এনে ঠাকুর মশায়কে দিতে গেল। ঠাকুর মশায় রেগে উঠলো। তাপসকে মারতে গিয়ে ঠাকুর মশায় পড়ে গেল। ঠাকুর মশায় আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। ঠাকুর মশায়ের পা চেপে ধরলো তাপসের মা। ব্রাহ্মণ পা সরিয়ে নিলো, তাপসের মাথা গরম হয়ে গেল। তাপস চাল ডাল পটলের পুটলা কেড়ে নিলো, বললো, এই চাল আমি ভিক্ষা করে এনেছি, আপনাকে দেব না, আমরা আজ দশদিন না খেয়ে আছি; আমার বোন ক্ষিধেতে কাঁদছে; আপনার তো অনেক আছে!

আশেপাশে ছড়িয়ে পড়লো তাপস ঠাকুরমশায়কে মেরেছে। কিছু লোক এসে তাপসকে আচ্ছা মতো লাটি পেটা করলো। ঠাকুর মশায় তার পুটলাগুলো নিয়ে তাপসকে অভিশাপ দিতে দিতে তার বাড়ির পানে রওনা দিলো। লোকগুলো নানা কথা বলতে বলতে চলে গেলো। তাপসকে জড়িয়ে ধরে বোন মা অঝরে কেঁদে উঠলো!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here