রু মোপাসাঁ ॥ শাহনাজ পারভীন

0
101
views

অভির ইচ্ছে ছিল—কাশবনের কবি হবে। সবাই যখন মহাকবি, বিশ্ব কবি, জাতীয় কবি, পল্লীকবি, রেনেসাঁর কবি, নৈঃশব্দ্যের কবি ইত্যাদি নানা অভিধায়ের উপাধিতে ভূষিত কবি হয়েছেন, সেখানে ওর বেশি কিছু চাওয়ার নেই। ও নিটোল কাশবনের কবি হতে চায়। এ স্বপ্নটা ওর আজন্ম। সরকারি এম এম কলেজে এইস এসসি পড়ার সুবাদে যখন প্রথম হাঁটি হাঁটি পা পা করে গ্রাম থেকে যশোর শহরে পা রাখে, সেই তখন থেকেই। ওর এলাকার ছেলেরা যখন ঝিনাইদহ কেসি কলেজে ভর্তি হবার স্বপ্ন দেখেছিল, ও তখন এক ধাঁপ এগিয়ে ছিল যশোর এম এম কলেজ পর্যন্ত। কলেজে ভর্তি হবার পরই ও ওর স্বপ্ন সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এবং অনাগত জীবনের ছক আঁকে স্বপ্নের খাতার পাতায় পাতায় ছবির মত বহুবর্ণিল। যশোরের বিভিন্ন সংগঠন ছাড়াও যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরির গোল টেবিল ‘শনিবাসরীয় সাহিত্য আসর’ এর প্রত্যেকটি আসরে ও নিয়মিত হয়, তখন ওর ভেতরে আত্মবিশ্বাস দানা বেঁধে ওঠে। ও পারবে। ওকে অবশ্যই পারতে হবে।

ভাল ছাত্র হিসেবে অভির সুনাম আছে। এস এস সি পর্যন্ত ও বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল। ও বড় ভাইদের কাছ থেকে শুনেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য বিভাগের চেয়ে মানবিক বিভাগে ভর্তি হওয়া অধিকতর সহজ। তাছাড়াও, শুধু সাহিত্যের টানেই এইস এসসি তে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়। বিজ্ঞান বিভাগের পড়া কমিয়ে সেই সময়টা ও সাহিত্যের পেছনে দেয়। শুরু হয় নিজেকে তৈরির যুদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ দিয়েই শুরু। শেষ পর্যন্ত থিতু হয় মাইকেল মধুসূদনে। এইচ এস সির সিলেবাসে প্রথম শুরু ‘মেঘনাদ বধ’ মহাকাব্য দিয়ে। তারপর তাঁর চতুর্দশপদী কবিতা থেকে  প্রবন্ধ, নাটক, শর্মিষ্ঠা নাটক, পদ্মাবতী নাটক, কৃষ্ণকুমারী নাটকসহ চিঠি, প্রহসন, একেই কি বলে সভ্যতা, বুঁড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ পাঠসহ প্রতি সপ্তাহেই সে লাইব্রেরি থেকে নতুন নতুন বই ইস্যু করে। পড়া শেষে পুরনো বই জমা দেয়। পুনরায় নতুন বই ইস্যু করে। কলেজ ক্যাম্পাসের মিছিল, মিটিং, ছাত্র রাজনীতি এড়িয়ে চলে।  পরিপাটিভাবে চলার জন্য, বাড়িতে মায়ের জন্য, সর্বোপরি নিজেকে তৈরি করতে দু’তিনটি টিউশনী করে। টিউশনীর কল্যাণে হাত খরচের পাশাপাশি বিগত ক্লাসের গ্রামার, গণিত, অ্যালজাবরা, ত্রিকোণীমিতির কঠিন সুত্রগুলো চোখের সামনে ভাসতে থাকে অনবরত। মোট কথা সময়টা কাজে লাগায় ঘড়ি ধরে ধরে, সময় মতো। এম এম কলেজের পুরনো হোস্টেলে থাকে অভি। ক্লাসের সময় ছাড়া দিনরাত মাথা গুঁজে পড়াশোনা করে। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে খুব একটা যায় না। এরই মধ্যে কয়েকবার গিয়েছে সাগরদাঁড়ি। কবির পৈতিক বাসভবনে। গিয়েছে কলেজ থেকে, গিয়েছে যশোর সাহিত্য কেন্দ্র থেকে সরকারি ভাবে মধু মেলায়। শুরু হয় অভির ভার্সিটির জীবন। ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় প্রথম দিকে থাকার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পছন্দ মতো সাবজেক্ট পায়।

এবার এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বন্ধুদেরকে নিয়ে। শীতের ছুটিতে যশোরের খেজুরের রস, পাটালি,পায়েস, পিঠাপুলি, সরিসার ক্ষেত আর মধুসূদনের সাগরদাঁড়ী দেখাতে।

কবির এপিটাফের লেখাটিতে অভি অন্যরকম নস্টালজিক হয়—বন্ধু আনন্দকে দেখায়। দেখো এই হচ্ছে মহাকবির নমুনা!

দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ী কবতক্ষ-তীরে
জন্মভ’মি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী!

মাত্র কটা লাইন। যেন গণিতের সূত্র। ১৪ গুণন ১৪ তে শেষ। মাত্র কয়টা শব্দ? অথচ! কি হৃদয়স্পর্শী। অভি অবাক হয়ে যায় কবিতার সাথে গণিতের কি অপরুপ মেলবন্ধন! তাঁর জীবনী ঘেঁটেছে তন্ন তন্ন করে। পড়েছে প্রতিটি মুহূর্তের ঘটনা। তার সাগরদাঁড়ির শৈশব, কপোতাক্ষ। কোলকাতার কৈশোর, যৌবন। ভার্সাই এর যাপিত জীবন। তার ব্যারিস্টারী জীবনের গল্প এবং নানা টানা পোড়েন, অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি। আর্থিক ধার-দেনা, অর্থ-কষ্ট, সব মিলিয়ে তার লৈখিক এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানান গল্প। কপোতাক্ষ নদে কবি স্নান করতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতো। এদিকে তার জননী হাড়ির পর হাড়ি ভাত রান্না করতেন। যেন তার রাজপুত্র স্নান শেষে গরম ভাত খেতে পারে। তিনি যে কত আদরের একমাত্র পুত্র ছিলেন তা এই একটি ঘটনা থেকেই বুঝে নেয় অভি। অথচ মধুসূদন চেয়েছিলেন ইংরেজি শিক্ষা লাভ করে বড় কবি হতে। তাই তো প্রায় শৈশবেই তিনি পরিবার, সমাজ ও ধর্ম ত্যাগ করে প্রথমে খ্রিস্টান পাদ্রীদের আশ্রয়ে পরে জীবিকার সন্ধানে সুদূর মাদ্রাজে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। ধনী পিতার একমাত্র পুত্র মধুসূদন সমস্ত সুখ ত্যাগ করে নির্বান্ধব জীবন ও দারিদ্রকে বরণ করেছিলেন। শান্তি অপেক্ষা অশান্তি, গৃহ অপেক্ষা মুক্ত প্রান্তর তার প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তা কোন দুর্গ্রহের বা মহত্তর ভাগ্যের তাড়নায়? তার ব্যক্তিগত জীবনে হয়তো এর পরিণাম শোচনীয় হয়েছিল, কিন্তু তার বৃহত্তর জীবনের আশ্বাস তার কাব্যে ধ্বনিত করেছিলেন।

তিনি নিজেকে তৈরিও করেছিলেন অপার বিস্ময়ে।
আনন্দের কথায় অভি ফিরে আসে যেন বর্তমানে-

হ্যাঁ। শিখেছিলেন প্রচুর ভাষা। ঘড়ি ধরে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। এক চিঠিতে ১৮৪৯ সালের ১৮ আগস্ট  গৌরদাসকে তিনি জানান স্কুলের ছাত্রের চাইতেও আমি বেশি ব্যস্ত। এই আমার রুটিন—৬-৮ টা হিব্রু, ৮-১২টা গ্রিক, ২-৫ টা তেলেগু ও সংস্কৃত, ৫-৭ টা ল্যাটিন, ৭-১০ টা ইংরেজি। এত ভাষা তিনি শিখেছিলেন বাংলা ভাষাকে ঋদ্ধ করার জন্যই তো না কি?

তা তো অবশ্যই। তিনি আর একটি চিঠিতে গৌরদাসকে লিখেছিলেন, বিলেতে গেলে তিনি অবশ্যই বড় কবি হবেন। তাই বন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন এই বলে যে, আইরিশ কবি টমাস মূর যেমন বায়রনের জীবনী লিখেছেন, তেমনি গৌরদাসও যেন তাঁর জীবনী লেখেন।
কিন্তু তার স্বপ্ন আর তার পিতার অভিপ্রায়ের অভিলাষ এক ছিল না।
মাঝখান থেকে বলে ওঠে মৌসুমী।

তোমরা নিশ্চয় জেনে থাকবে, গভীর মনোবেদনায় এক রাতে তিনি গৌরদাসকে লিখেছিলেন I wish (Oh! really wish) that somebody would hang me!  তাঁর স্বপ্ন আর সাধ্যের মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তার পিতার অভিলাষ: একটি দশমবর্ষীয়া বালিকাকে বিবাহ করতে হবে। বন্ধুকে তিনি আরো বলেছেন, ইংল্যা- তাকে যেতেই হবে, নইলে বড় হতে পারবেন না। বিয়ে করা হবে তাঁর পক্ষে আত্মহত্যার সামিল।

গতকাল আমার ডিপার্টমেন্টের ক্লাসে নইম স্যার বলছিলেন—‘আজকের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নির্মাতা মধুসূদন বাংলা নয়, ইংরেজি সাহিত্যে কাব্য, নাটক, প্রবন্ধ ও পত্রাবলী রচনা করে সাহিত্যজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিলেন তাই তার সাহিত্য জীবনের প্রথম দুই দশকের (১৮৩৯-৫৭ খ্রি.) সকল রচনা ছিল ইংরেজিতে। ১৮৫৮ খ্রি. প্রথম নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ তিনি বাংলায় রচনা করেন। তারপর থেকে আমরা তার হাত দিয়ে বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান সব লেখা পাই।’

তোমার তো ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট, মৌসুমী?
হু তোমার মার্কেটিং তো, তুমি?
আমি মার্কেটিং। আনন্দের সংক্ষিপ্ত উত্তর। কিন্তু অভি,  তিনি তাঁর সব চিঠি কিন্তু ইংরেজিতেই লিখেছেন।  প্রায় দেড়শত চিঠি তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন এবং একটি মাত্র চিঠি সম্পূর্ণ বাংলা এবং একটির এক অনুচ্ছেদ তিনি বাংলায় লিখেছিলেন।

তুমি চিন্তা করতে পারো আনন্দ, সাহিত্য সৃষ্টির মতোই তিনি চিঠি রচনাতেও ছিলেন স্বচ্ছন্দ এবং অনায়াস। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার বন্ধুদের কাছে চিঠি লিখেছেন নিয়মিত।

ধর্মান্তরিত হবার কারণে তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও কখনই বন্ধু বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। এই চিঠিগুলিই কার প্রমাণ।

হু, তুমি ঠিক বলেছো অভি। বিশেষ করে, গৌরদাসের কাছে লেখা টিঠিতে তার জীবনের খুঁটি নাটি সব বিষয়গুলো যেমন, বিলেত, মাদ্রাজ, ভার্সাই এর জীবন, তার ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ, আকাক্সক্ষা নিঁখুত ভাবে ফুটে উঠেছে। পাঠকরা জানতে পেরেছে তার চুলচেরা জীবনের সবকিছু। বলতে পারো এই চিঠির মাধ্যমেই কিন্তু তার ব্যক্তিজীবনের একটি সরল পাঠ ফুটে উঠেছে সর্বত্র।

সময় পেলেই ওরা কি সাগরদাঁড়ী, কি যশোর, কি ঢাকায়, কি পড়ার টেবিলে কি সাহিত্যের আড্ডায় বসে মধুসূদনকে নিয়ে বহুমাত্রিক আলোচনা করে। তাঁকে নিয়ে আসে তাদের তিনজন, চারজন করে কিংবা আরো অনেকের সাথে তিনিও থাকেন অবিরাম। সবার চোখেই মধুসূদন এক অমিমাংসিত বিস্ময়!

বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি বহুমাত্রিক পড়াশোনায় অভি ব্যস্ত রাখে নিজেকে। শাহবাগ  পাবলিক লাইব্রেরি, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন যখন শেষের দিকে তখনই অভির বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। যেমন সে এম এম কলেজে পড়ার সময় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছিল, তেমনই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বিসিএস এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে। ফলশ্রুতিতে প্রথমবারের বিসিএস পরীক্ষাতেই সে পাশ করে। শুরু হয় নতুন জীবন। বাহিরে ভেতরে আত্মবিশ্বাস দানা বেঁধে ওঠে। দানা বেঁধে ওঠে মননেও।

অফিসের কাজের ব্যস্ততায় দিনটা কেটে যায় চোখের নিমিষে। রাতটা তো তারই। কোনও আড্ডার আমোদে সময় নষ্ট করে না অহেতুক। সময় পেলেই মাথার মধ্যে ঘুরিয়ে আনে মধুসূদনকে। নিজেকে শানিত করে বিভিন্ন পাঠে। বাহিরে তার সাহেবী পোশাক, ভেতরে তার পরিপূর্ণ এদেশীয়, বাঙালি, যশোহরবাসী। অভি যত ভাবে ততই আশ্চর্য হয়ে যায়। এরই মধ্যে অভির টুকিটাকি লেখা প্রকাশ পাচ্ছে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায়। সুযোগ থাকলে শুক্রবারের বিকেলগুলোতে ঘুরে আসে সাহিত্য পাড়ার আসরগুলোয়। ইদানীং বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোতে কথা এবং কবিতার জন্য ডাক পড়ছে বিভিন্ন চ্যানেলগুলোতে। শুক্র, শনি দুদিন অফিস সরকারিভাবে ছুটি থাকলেও বিভিন্ন প্রশিক্ষণে উপস্থিত থাকতে চেষ্টা করে প্রাণান্ত। যে কোনও সময়, যে কোনও কাজে নিবেদিত প্রাণ অভি সহজেই বিভাগীয় সিনিয়র স্যারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়।

দেশের বেশিরভাগ জেলাগুলিতে অফিসিয়াল যাবতীয় ট্রেনিং এর পাশাপাশি দেশের বাইরেও বিভিন্ন সেমিনার সম্মেলনে যোগ দেবার সুযোগ পেয়ে যায় সহজেই। মেধা, বুদ্ধি এবং আন্তরিকতা এক বিন্দুতে যখন মিলিত হয় তখন ভাগ্য এমনিতেই এসে হাতের মুঠোয় খেলা করে। অভির বেলায়ও তার কোন ব্যতিক্রম হয় না। চাকরিতে জয়েন করার বছর তিনেকের মাথায় তার বিদেশ ট্যুর শুরু হয়। কোলকাতা, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, ভুটান, মালয়েশিয়া থেকে শুরু করে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ভ্রমণ শেষ করেছে ইতোমধ্যেই। এবারের যাত্রা ফ্রান্স। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ টানা দশদিনের এই ভ্রমণে সে আগে থেকেই প্লান করে রেখেছে সে রু মোপাসাঁয় যাবে। অফিসিয়াল ট্যুর এর ফাঁকে ফাঁকে সে অন্য ভ্রমণের মতই বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখবে। সেভাবেই সে তার সিডিউল সাজিয়েছে। গতকাল গিয়েছিল লুভার মিউজিয়ামে। ঘুরে ঘুরে দেখেছে সে। মোনালিসার ছবির কাছে এসে সে কতক্ষণ আটকে ছিল মনে করতে পারে না। মোনালিসার চোখের কোণে, ঠোঁটের পাশে যে হাসির রেশ তা তার ভ্রু বিহীন বে আব্রু চোখকে আটকাতে পারে না মুহূর্তেও। ও জানে, জীবিত মোনালিসার থেকে মৃত মোনালিসা অনেক বেশি দামী। আবেদনময়ী।

আজ সে তার সিডিউল সময় অনুযায়ী উপস্থিত হয়েছে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বহু স্মৃতিবিজড়িত রূ মোপাসাঁয়। ঘন নীল আকাশের নীচেয় গাঢ় সোনালী রংয়ের দীর্ঘ ভবনের সামনে কারুকার্যখচিত গেটের সামনে দাঁড়ায় অভি। সেখানকার কিছু আনুষ্ঠানিকতায় অভি মুখোমুখি হয় এক জুনিয়র অফিসারের। কথা হয় দোভাষীর মাধ্যমে:

হয়ার আর ইউ কাম ফ্রম?
আই কাম ফ্রম বাংলাদেশ।
আগ্রহ কিসে? এখানে কেন?

মাইকেল মধুসূদন দত্ত তো এক সময় এ বাড়িতেই থাকতেন?
ওকে ঠিক আছে। আসুন।
কাঁপা কাঁপা পায়ে পথনির্দেশকারীর দেখানো পথে চলতে থাকে। অভির মধ্যে এক উত্তেজনা কাজ করে। ও জানে,

স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়ির দোতলার ছোট্ট দুটি ঘরে ১৮৬৩-১৮৬৫ সাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত বসবাস করেন। এ বাড়িতে বসেই তিনি রচনা করেছিলেন চতুর্দশপদী কবিতা। এ সময় তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। ধারদেনায় নিঃস্ব কবিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অর্থ পাঠিয়ে রক্ষা করেন। আর্থিক সচ্ছলতা কিছুটা ফেরার পরই অন্য এলাকার তুলনায় গরিব পাড়া থেকে এক লাফে ভার্সাইয়ের সবচেয়ে বনেদি পাড়া রাজপ্রাসাদের গা ঘেঁষে প্রাসাদের সবচেয়ে বিখ্যাত ফোয়ারা Bassin de Neptune-এর মুখোমুখি ফ্ল্যাটে হেনরিয়েটাকে নিয়ে তুলেছিলেন। এ বাসার ঠিকানা ১২ নম্বর রু মোপাসাঁ। ১৮৬৯ পর্যন্ত হেনরিয়েটা এ বাসায় বাস করেছেন কলকাতায় ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। এ বাসাতেই জন্ম হয়েছিল কবির ছোট ছেলে এলবার্ট জর্জ নোপোলিয়ানের।

সিঁড়ি দিয়ে ঢুকতেই অভির চোখ ছানাবড়া। ওর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মধুসূদন। ডান হাতে তার নীল একটি নকশাওয়ালা কলম, বাম হাতে ধরা ঠান্ডা বিয়ারের নতুন বোতল।

হ্যালো…অভি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না তাকে কি বলে সম্বোধন করবে? সালাম, নমস্কার নাকি হ্যালো। ওর চটজলদি মনে পড়লো মধুসূদনের নামের আগে মাইকেল শব্দটি সে জুড়ে নিয়েছিল বিয়াল্লিশেই। অতএব সে ‘হ্যালো’ বলেই হাত বাড়িয়ে দিলো অভিবাদনের জন্য।

মধুসূদনও তার বলিষ্ঠ হাত এগিয়ে দিলেন হাসিমুখে।
আমি অভি। কবিতাকর্মী। সরকারি অফিসার।

ও হো! কবিতা কর্মী? সরকারি অফিসার? কনগ্রাচুলেশান। দুটোতো একসাথে মেলানো ভার!

আমি বাংলাদেশের যশোর জেলা থেকে এসেছি।
যশোর জেলা!
হু, আমি যশোর জেলার।
হা! যশোর জেলা! সাগরদাঁড়ি, জানো?
হু গিয়েছি অনেকবার। আপনার জন্মস্থান দেখেছি। এবার আপনাকে দেখতে এলাম।
আমার কপোতাক্ষ নদ? আমার সবুজ মাঠ? তুলসি তলা? বাদাম গাছ?
সব আছে আগের মতো! ঝকঝকে। তকতকে। শুধু নদীটি শীর্ণ। স্রোত নেই।
স্রোত নেই? তাহলে আর নদী কেন? প্রাণহীন নদী আবার নদী হলো?

না, না, প্রাণ আছে? নদীতে ড্রেজিং চলছে। সরকার চেষ্টা করছে স্রোত ফিরিয়ে আনবার। সরকার বদ্ধপরিকর।

গাছ? সে আম গাছ আছে? সেই বট, পাকুর? খেজুর গাছের সাঁরি সাঁরি। মাঠভর্তি সরিসার খেত, সবুজ ধানের দোলা!

সব আছে। আরো সুন্দর। আরো মনোমুগ্ধকর। প্রতি বছর মেলা হয়। সরকারি মেলা। মধু মেলা। বিভিন্ন জেলা থেকে, রাজধানী থেকে প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিক আসেন। সাত দিনব্যাপী মেলা হয় সেখানে।

বাহ! আমাকে ডাকো না কেন? রবি শংকরকেও ডাকতে পারো। সেক্সপিয়র, মিল্টন, গ্যাটে…

হু। থাকে তো সবাই। সে মেলার বাঘা বাঘা আলোচকদের আলোচনায় চলে আসেন সবাই। আপনি তো থাকন প্রতিদিনই। আপনার গান, কবিতা, নাটক, স্বাজাত্যবোধ, আপনার মহাকাব্য সব, সবই থাকে। আপনার এই ছবিটা দিয়েই তো সাজানো হয় মেলার গেট, মঞ্চ, করিডোর।

অভির সামনের দেয়াল জুড়ে হ্যাট মাথার ইংরেজি সাহেবী ছবিটাকে ইঙ্গিত করে অভি।

মধুসূদন খুশি হন। মাথা দোলান। অভিকে ভেতরে ডাকেন মধুসূদন।

অভি এগিয়ে যায় তার পেছন পেছন। ওর খুব তেষ্টা পেয়ে যায়। ওর মনে পড়ে যায়—মধুসূদন খুব পান করতেন। আবারও তাকিয়ে দেখে তাকে। বিশেষ করে তার ডান হাতে, তার বাম হাতে, তার টেরা কাটা ইংরেজি ছাটের চুলে! অনবরত পান করে অকালেই ঝরে গেলেন তিনি। নিদারূণ অর্থকষ্টে পড়লেন এই অনিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপনে। কিন্তু এখানে তো তাকে গোছানো পরিশীলিত জীবনের নায়ক মনে হচ্ছে! ব্যাপার কি? কিন্তু…

ও হাঁটতে থাকে দ্রুত। মধুসূদন আগে আগে। পেছনে অভি। ডান দিকে বাঁক নিতেই বিশাল একটি চিত্রকর্ম দেখে অভি। হেনেরিয়েটার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাইকেল। হেনেরিয়েটাকে খুব খুশি খুশি মনে হচ্ছে। আর মাইকেলকে মনে হচ্ছে সুখি। অন্য একটা ছবিতে কোমড় জড়ানো মাইকেল হেনেরিয়েটা। সুখি কাপল। পরিস্ফুটিত।

ওটা ডান পাশে রেখে বামে ঘুরতেই ছবিটার কোণায় লেগে ওর পায়ে একটু আঘাত লাগে। ওর ঘুম ভেঙে যায়। জেগে ওঠে।  ও শুয়ে আছে ওর নির্ধারিত পাঁচতারা হোটেলের এসি রুমে। কিন্তু  ঘেমে জবজব। সেই তেষ্টা। ওর নাকে এখনো মধুসূদনের পারফিউমের সুবাস সারা ঘর মৌ মৌ করছে। ও নিজের হাতে চিমটি কাটে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here