সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে সমাজ পরিবর্তন হবে না ॥ সুমন ভৌমিক

0
309
views

[সুমন ভৌমিক—প্রকৃত নাম অমৃত লাল ভৌমিক। জন্ম নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার পূর্ব রাজুরগাঁও গ্রামে। বর্তমানে জাতীয় দৈনিক বণিক বার্তার জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও কর্মরত। পাশাপাশি সম্পাদনা করছেন  স্থানীয় দৈনিক চলমান নোয়াখালী। এছাড়া নোয়াখালী প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষের পদে দায়িত্ব পালন করছেন।]

সুতরাং: এই সময়ের লাভজনক অনেক পেশা থাকতে সাংবাদিকতাকে বেছে নিলেন কেন?
সুমন ভৌমিক: প্রশ্নটা সত্যিই জটিল। এককথায় উত্তর দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।  তাই একটু বিস্তারিত বলতে চাচ্ছি। আমার লেখালেখির অভ্যেসটা মূলত নবম শ্রেণী থেকে শুরু।  ভালো লাগা থেকে।  নিজ বিদ্যালয়ে প্রজাপতি নামক একটি দেয়ালিকা দিয়ে আমার লেখালেখির পথচলা। সে থেকে স্বপ্ন বুনতাম, একদিন বড় সাহিত্যিক হবো। ফলে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্যজগতের বই পড়তে শুরু করলাম। পড়তে শুরু করলাম রাজনীতি, অর্থনীতিসহ নানা বিষয়। এরপর এলোমেলো হয়ে গেল সব চিন্তা।  এক সিনিয়র সাংবাদিকের একটি ঘটনার পর থেকে তার ওপর রাগ করে মনে মনে শপথ নিলাম—একদিন আমিও সাংবাদিক হবো।  আপনি পারেননি! আমি একদিন সাংবাদিক হয়ে সমাজের অন্যায়-অত্যচার তুলে ধরবোই। তারপর ২০০২ সালের দিকে আরেক সাংবাদিকের হাত ধরে ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টারের (এমএমসি) মাধ্যমে প্রান্তিক সাংবাদিকতার ওপর ৭ দিনের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিলাম।  এরপর ২০০২ সাল থেকে স্থানীয় সাংবাদিকতা  শুরু।। আমার বাবা একজন দেশপ্রেমিক, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিক।  বাসদ (মার্কসবাদী) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।  তার কাছ থেকেই মূলত মানুষ হওয়ার দিক্ষাগ্রহণ। তাই আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়ার কথা চিন্তা না করে সত্যিকারের একজন মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম।  চাইতাম বাবার মতো একজন দেশপ্রেমিক হবো। বাবাকে দেখেছি নিজের পরিবারের অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্টকে কিছু মনে না করে সব সময় গরিব-অসহায়-বঞ্চিত মানুষের পক্ষে সংগ্রাম করেছেন। তিনিই বলতেন, তুমি যদি তোমার ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাও, হয়তো তুমি একা ভালো থাকবে, কিন্তু একদিন তুমিও ভালো থাকতে পারবে না। এ রাষ্ট্রব্যবস্থা তোমাকেও ভালো থাকতে দেবে না। সুতরাং তোমাকে সব মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সংগ্রামে এগিয়ে আসতে হবে। যখন পুরো জাতির ইতিবাচক পরিবর্তন হবে, তখন তোমারও পরিবর্তন হবে। এ শিক্ষা থেকে নিজেকে পরিবর্তন শুরু করলাম। আমাদের পরিবারে বাবা, মা, দাদী ও আমরা তিন ভাই ছিলাম। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস আমাদের। এসব কথা বলছি অন্তত ২৫ বছর আগের। পুরো পরিবার চলতো আমার মায়ের ছোট্ট একটা চাকরির ওপর। তারপরও কোনোদিন লাখপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিনি। বাবার কথাকে লালন করে আমিও রাজনীতি করেছি। আর্থিক দৈন্যের কারণে কতবার পড়ালেখা বন্ধ করতে হয়েছে। দেখলাম অভিজ্ঞতা, মানবতা-মানবিকতা, জ্ঞান কোনো কিছুরই মূল্য নেই এ সমাজে। সার্টিফিকেট ছাড়া বাজারে আমাদের কোনো মূল্য নেই। তাই পেট চালানোর সংগ্রামের মাঝে লেখালেখি ও পড়ালেখা সবই চালিয়ে গেলাম। জীবনের গল্প অনেক বড়। এত গল্প হয়তো পাঠক পড়বে না। তাই প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দেই—আসলে সাংবাদিকতা পেশায় এসেছি সমাজের মানুষের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্য নিয়ে। বর্তমানে এসে বুঝতে পারলাম মফস্বল সাংবাদিকতা করে ভাত খাওয়া অনেক কষ্টের। গণমাধ্যম হাউজগুলো এমন অবস্থা করে দিয়েছে মফস্বল সাংবাদিকদের হয় ভিক্ষা করতে হবে, না হয় চাঁদাবাজি করতে হবে। তারপরও দু-একটা হাউজ কোনোমতে ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। তবে তা একজনের জন্য। এ সাংবাদিকতা করে পরিবার চালানো মুশকিল। তবু একটা বৈধ পেশায় থেকে এ জগতে আশা।  আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি—সাংবাদিকতা সত্যিই বড় চেলেঞ্জিং পেশা। এখানে অর্থ যেমন কম, তেমনি জীবনের ঝুঁকিও অনেক বেশি। তবু লড়ে যাচ্ছি।

সুতরাং: আপনি কি মনে করেন, সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব?
সুমন ভৌমিক:
 শুধু সাংবাদিকতা দিয়ে কোনোভাবেই এ দুর্গন্ধজনিত পচা সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়।  সাংবাদিকতার সুবাদে দেখেছি, সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচন ধরেছে। সাংবাদিকতা পরিবর্তনের একটি মাধ্যম হয়তো। কিন্তু তাতেও এখন ভেজাল। যতক্ষণ পর্যন্ত না গণমাধ্যম হাউজগুলো সত্যিকারের স্বাধীন না হবে, গণমাধ্যমের মালিক যতক্ষণ পর্যন্ত না সাংবাদিক হবে, ততক্ষণ কোনোভাবেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ এ মাধ্যমটি কোনো কাজে আসবে না। গণমাধ্যমের মালিক যখন সাংবাদিক হবে, তখন সাংবাদিক নিয়োগেও সতর্ক হবে তারা। আমি মফস্বলের কথা বলছি। মফস্বলে সত্যিকারের সাংবাদিক হাতে গোনা দু-একজন পাওয়াও মুসকিল হয়ে যাবে।  মনেপ্রাণে যদি সাংবাদিক না হওয়া যায়, সাংবাদিকতাকে যদি কমিটমেন্ট মনে না করে, সাংবাদিকতাকে যদি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার মনে না করে; তাহলে কোনোভাবেই পরিবর্তন হবে না। কারণ মফস্বলে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের বেশিরভাগেরই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তাই তারাও ভিন্ন পথে হাঁটে। সব কিছু যেনে শুনে যারা সাংবাদিকতায় আসবে তারা হয়তো পরিবর্তনের কিছুটা হলেও হাতিয়ার হতে পারবে।

সুতরাং: আপনার এমন কোনো প্রতিবেদনের মনে করতে পারেন, যেটি প্রকাশিত হওয়ার পর কার্যকর প্রভাব পড়েছে?
সুমন ভৌমিক: এমন বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন রয়েছে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি বণিক বার্তায় আমার লেখা ‘নেই কোনো স্কুল, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা; নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত সুবর্ণচরের চার গ্রামের মানুষ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ। তৎকালীন সময় সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন খালেদ মেহেদি হাসান। তিনি এ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর দুর্গম ওই চরে সশরীরে গিয়েছিলেন। পর্যায়ক্রমে সেখানকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। দ্বিতীয়ত হলো, সম্প্রতি তাও সুবর্ণচর কৃষি বিষয়ে। ‘সুবর্ণচরে তরমুজে নিয়ন্ত্রণহীন অজানা রোগ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর কৃষি বিভাগের প্রতিনিধি দল এ অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করেন।  রোগ নির্ণয় করেন। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে কাজ করার আশ্বাস দেন। এমন বেশ কয়েকটি রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়, আমার জানামতে আমি বণিক বার্তায় কাজ করছি যত বছর, তত বছরে আমার লেখা কয়েক শত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সব সংবাদই প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে করা।  কিন্তু যে হারে লিখেছি, সে হারে প্রভাব পড়েনি। এর কারণ যারা এ সংবাদ দেখে কাজ করবে, তারা তো সংবাদ পড়েই না। তাদের কোনো দায় নেই। তারা ভাবে, চাকরি করতে এসেছি, সময় মেপে চলে যাবো। মাস শেষ বেতন নেবো। আমৃত্যু পেনশন সুবিধা পাবো। সুতরাং দরকার কী? তাছাড়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি সে রকম হতো, তাহলে হয়তো প্রত্যেকটি সংবাদেরই গুরুত্ব থাকতো।

সুতরাং: আপনি কি আপনার অবস্থানে থেকে রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের সমালোচনা করতে পারেন? তাদের অসঙ্গতিগুলো ধরিয়ে দিতে পারেন? ধরিয়ে দিলে তারা সংশোধন করে?
সুমন ভৌমিক:  আবারও জটিল প্রশ্ন। সমালোচনা করতে পারি না, তা বলবো না।  কোনোভাবে না কোনোভাবে সমালোচনা করছি। লেখার মাধ্যমে কিংবা আলোচনার মাধ্যমে। অসঙ্গতি তো ধরিয়ে দেই নিজের লেখার মাধ্যমে। কিন্তু তারা হয়তো সেটাকে ভালোভাবে নেন না। তারা অসঙ্গতি না ভেবে উল্টো বলে ফেলেন আমরা শুধু নেগেটিভ নিউজ করি। তাদের সমালোচনা করি। তাই মাঝে মধ্যে আমাদের নিমন্ত্রণ তালিকা থেকে বাদ দেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশোধন হন না তা বলা যাবে না, সংশোধন হয়।  যেগুলো না হলেই নয়, তেমনগুলো সংশোধন করেন।  বেশিরভাগ সময় তারা সংশোধন করেন না। স্বেচ্ছাচারিভাবে চলেন। তারা মনে করেন সাংবাদিক তাদের কিছু করতে পারবে না। আসলে সাংবাদিকতো কিছু করতে পারে না, ঘটনা তুলে ধরেন মাত্র। তবে হ্যাঁ, সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ সোচ্চার হতো, তাহলে হয়তো অনেক পরিবর্তন আসতো। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা রয়েছে। তাই তারাও নিজেদের অধিকার বোঝে না। মানুষ যতক্ষণ না সচেতন হবে, যতক্ষণ না এ দেশের মানুষ সুশিক্ষিত হবে ততক্ষণ পরিবর্তন হবে না।

সুতরাং: মফস্বলে বসে সাংবাদিকতা করেন বলে কেন্দ্রের সাংবাদিকরা আপনাকে কম মূল্যায়ন করে বলে মনে করেন?
সুমন ভৌমিক: সরাসরি মূল্যায়ন করে না এ কথা বলা মুশকিল। তবে অবমূল্যায়নের অনেক উদাহরণ দিতে পারবো। কিন্তু দেব না। এখানে সৎ সাহস দেখাতে গিয়ে কাউকে ছোট করতে চায় না। তবে সবায় যে অবমূল্যায়ন করেন তাও নয়। এ ক্ষেত্রে গত পাঁচ-ছয় বছরে অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। আগে দেখতান ঢাকার সাংবাদিকরা কথাও বলতো না। বিভিন্ন হাউজে কর্মরত সহকর্মীদের কাছ থেকে শুনতাম ডেক্স থেকে ফোন করে ব্যবহারও খারাপ করে। কর্মচারির মতো আচরণ করে। আমিও এমন আচরণের শিকার হয়েছি একাধিকবার। তবে ইদানিং এসব তেমন চোখে পড়ে না। ঢাকার সাংবাদিকরা বেশ মর্যাদা দেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সহযোগিতা পেয়েছি। অবমূল্যায়নের বিষয়ে আমি শুধু ঢাকার সাংবাদিকদের দোষ দেব না। আমরা যারা মফস্বলে কাজ করি, তারা আসলে কতটুকু কাজ জানি বা করি, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। মফস্বলের অনেক সাংবাদিক রয়েছেন, যারা সাংবাদিকতায় পড়ালেখা না করলেও সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। কিন্তু তাদের লেখালেখি করার মতো প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা নেই। ফলে সাংবাদিকতার চেয়ে ধান্দাবাজি বেশি করে।  যদি আমি ভালো কাজ করি, নিশ্চয়ই আমাকে সম্মান করতে বাধ্য ঢাকার সাংবাদিকরা।

সুতরাং: আপনার পেশাগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
সুমন ভৌমিক: মফস্বল থেকে প্রকাশিত এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রিন্ট মিডিয়ায় আমার কর্মজীবন প্রায় ১৭ বছর। এবার ইচ্ছা রয়েছে টেলিভিশন সাংবাদিকতা করার। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সাংবাদিকতা করতে চাই। তবে এ জন্য কর্মরত মিডিয়া হাউজের সহযোগিতা অনেক বেশি দরকার। তারা যদি একজন মফস্বল প্রতিনিধিকে মূল্যায়ন করেন, তাহলে সত্যিই মহান এ পেশা সব সময়ই মহান থাকবে। মফস্বল সাংবাদিকরাও সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here