হরেন বাবু ॥ শারমিন রহমান

0
78
views

বেঁটে, শ্যাম বর্ণের বয়স্ক একজন লোক বাবা-মার সঙ্গে বসে চা খাচ্ছে, মাথাভর্তি পাকা চুল দাঁড়িয়ে আছে, কদম ফুলের মতো দেখতে লাগছে আনেকটা। নাকটাও বেশ মোটা। তনু এই লোকটাকে কখনো দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না। খেলা ফেলে আসতে হয়েছে বলে মেজাজ তার খারাপ হয়েই ছিল, তার ওপর এই লোকের সঙ্গে দেখা করতে বাবা ডেকেছে বলে আরও রাগ হচ্ছে ওর। বুড়ো মানুষের সঙ্গে দেখা করার কী আছে? বাবা যে কী করে বোঝে না সে! বাবা সব নীরবতার অবসান ঘটিয়ে বলেন, তনু, মা এই তোমাদের নতুন স্যার, হরেন বাবু, প্রতিদিন সকাল ৬ টায় এসে পড়িয়ে যাবেন। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তনু তাকিয়ে থাকে বয়স্ক লোকটির দিকে।এ পড়াবে আমাকে? সবাই মিলে সুবোধ স্যারের বাসায় পড়তে যায় সকালে, কত মজাই না হয়, গল্প করতে করতে যাওয়া আবার একসঙ্গে ফেরাও যায় সবাই মিলে! বাবাকে স্যারের কাছে পড়তে যাওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু বাবা এ কোন বুড়ো মানষ কে ধরে আনলেন? ভাবতেই বাবার ওপর রাগ হতে লাগল ওর। কী ভাবছ মা? স্যারকে সালাম দিলে না যে? সম্বিৎ ফিরে তনু তাড়াতাড়ি করে সালাম দিয়ে পাশের রুমে চলে গেলো। স্যার বিদায় নেওয়ার পর বাবা তনুকে ডেকে বলেন, আজ যা করেছ, তা আমার একটুও ভালো লাগেনি, উনি খুব ভালো শিক্ষক, এই এলাকার যত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সব হরেন বাবুর ছাত্র। খুব মন দিয়ে পড়বে, একদম বেয়াদবি করবে না। সে রাতে আর পড়া হলো না তনুর, বন্ধুদের সঙ্গে পড়তে যেতে পারবে না বলে খুব মন খারাপ হচ্ছিল, না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে সে।

পরের দিন সকালে কাজলের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙে তনুর। খালা ওঠেন, নতুন স্যার আইসা বইসা আছে, আফায় ডাকতাছে। কাজল তনুদের বাসায় কাজ করে। বড় ভালো মেয়ে, ভালোবাসে তনুকে। একলাফে বিছানা ছাড়ে ও। স্যারকে বসিয়ে রেখেই হাত মুখ ধুতে যায় তনু। ফিরে দেখে স্যারকে চা-নাস্তা দেওয়া হয়েছে, তিনি হাসিমুখে তা খাচ্ছেন। গায়ে পাতলা একটা চাদর। শীতের সকাল, কুয়াশা কাটেনি ভালো করে, এই বয়স্ক মানুষটা এত ভোরে কী করে এলেন? অবাক হয়ে তনু জানতে চায়, স্যার এত ভোরে আপনি কী করে আসলেন? ভ্যান গাড়ি ছিল রাস্তায়? একগাল হেসে হরেন বাবু উত্তর দেয়, আমি তো হেঁটে আসি, সকালের ব্যায়াম ও হয়ে যায়, কাজেও আসা হয়ে যায়। আমার সকালের স্নিগ্ধ বাতাসটা খুব ভালো লাগে, এত পবিত্র মনে হয় নিজেকে! তুমি খুব ভোরে কখনো হেঁটেছ? তনু মাথা নেড়ে উত্তর দেয়। স্যার বলে খুব ভোরে উঠে হাঁটবে, দেখবে পৃথিবীটা কত সুন্দর!

খুব ভালো লাগল স্যারের কথাগুলো তনুর।এরপর আস্তে আস্তে স্যারের বাড়ি, পরিবার সব জানলো তনু। মজার ব্যাপার হলো স্যার ভালো বন্ধু হয়ে গেলো তনুর।

হরেন বাবু প্রথম দিনেই বলেছিলেন, শোনো, পড়াটাকে সিরিয়াসভাবে নেওয়ার কিছু নেই, যখন মন চাইবে পড়বে, মন না চাইলে পড়বে না। সবসময় ভালোবেসে পড়বে, ক্লাসে প্রথম হওয়ার জন্যে পড়বে না। তোমার মন যা চাইবে তাই করবে, মনের কথা শুনবে সবসময়। ভালো রেসাল্ট করার চেয়ে জরুরি ভালো মানুষ হওয়া।

তনুর এই কথাগুলো মনের মধ্যে দাগ কাটে যেন, মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে। তনু খুব আদরের মেয়ে বাবা-মার। কষ্ট কী, বোঝে না সে। অল্পতেই কেঁদে ফেলে। একদিন স্যারের কাছে জানতে পারে, স্যারের বড় ছেলে ভারতে গিয়েছিল ব্যবসা করতে।

কারা যেন টাকাগুলো নিয়ে ছেলেটাকে মেরে ড্রেনে ফেলে যায়। গলা আর শরীরটা আলাদা আলাদা জায়গায় পায় পুলিশ, কী সব ঝামেলার কারণে লাশটা দেশেও আনতে পারেনি! স্যারের ভাগনেরা লাশটা দাহ করে। সেই ছেলের দুই সন্তান আর বউয়ের সব দায়িত্ব এখন স্যারের। সেদিন স্যারের কথা শুনতে শুনতে কেঁদে বুক ভাসিয়েছিল তনু। স্যার সহাস্যে বলেছিল, কাঁদে দুর্বল মানুষ, চোখের পানিকে সস্তা করবে না কখনো। স্যারের কথায় কখনো তনু এটা বুঝতে পারেনি যে, স্যারের অভাব বা দুঃখ আছে।

হরেন বাবু একদিন তনুকে বলে, আমি তোকে বিউটি বলে ডাকব, আজ থেকে তোর নাম বিউটি। তনু সেদিন কোনো প্রশ্ন না করেই খুশি মনে বিউটি নামে সাড়া দেয়। সেই থেকে তনু হয়ে ওঠে হরেন বাবুর বিউটি। এভাবে খুব ভালো সময় কাটতে থাকে তনুর। ভালো রেজাল্ট করার চেয়ে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে ব্যস্ত সে। কিন্তু ভেবে পায় না কিভাবে ভালো মানুষ হবে! যেদিন বন্ধুদের কাছ থেকে পরীক্ষার আগে পাওয়া প্রশ্ন পেয়েও ফিরিয়ে দেয় তনু, হরেন স্যার জলভরা চোখে তনুর মাথায় হাত রেখে বলে, বিউটি তুই আমার গর্ব। তুই এত ছোট বেলায় এই লোভ সামলাতে পেরেছিস, তুই আনেক বড় হবি দেখে নিস।

সেবার রেজাল্ট অতটা ভালো হয়নি তবু কোনো কষ্ট পায়নি তনু। বরং অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ভরে উঠেছিল ওর মন। বাবা-মার বকুনিতেও কোনো কষ্ট হয়নি ওর। নবম শ্রেণীতে উঠলো তনু, হরেন স্যার নবম শ্রেণীর ছাত্র পড়ায় না। অনেক অনুরোধ করার পরেও স্যার রাজি হলো না পড়াতে। তনুর মনটা খুব খারাপ হয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঠিক হয়ে যায়, কিন্তু মনের ভেতর স্যার এর কথাগুলো ধ্বনিত হতে থাকে। ভালো মানুষ হতে হবে! কিছুদিন পর স্যারকে দেখতে খুব ইচ্ছে হলে খোঁজ নিতে থাকে তনু, জানতে পারে কুমার নদীর পাড়ে যে হিন্দু পাড়াটা আছে সেখানে পড়াতে আসে স্যার। ভদ্রদের ছেলে-মেয়ে পড়ায় স্যার।

তনু আরেক শীতের সকালে ভদ্র বাড়ি যায় স্যরের খোঁজে, উঠানে পা দিতেই দড়িতে স্যারের পাঞ্জামিটা ঝুলতে দেখে।একটু দূরেই ছেঁড়া গেঞ্জি পরে বসা স্যারকে দেখতে পায়। দেখেই সেই হাসি মুখ নিয়ে স্যার বলেন, কে রে, বিউটি? অনেক গল্প করে ফিরে আসার সময় ভদ্র গিন্নিকে চুপিচুপি ডেকে তনু বলে, স্যার সত্যি ভালো আছে তো কাকিমা? ভদ্র গিন্নি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলেন, তোমার চোখ নেই মেয়ে তুমি দেখতে পাও না? ওই তো একটা মাত্র জামা মানুষটার, আজ জোর করে ধুয়ে দিলাম শুকাতে, তাকানো যাচ্ছিল না। নিজের বউটা মরে গেছে, ছেলের বউ ও বাপের বাড়ি চলে গেছে শুনেছি, নিজেই রান্না করে খায় মানুষটা। তবু তেজ কমে না জানো? খেতে বললে রজি হয় না কিছুতেই। স্বীকার করতে চায় না যে অভাব আছে, শুনেছি ছেলেরা সবাই যার যার চাকরির চেষ্টা করছে, চাকরি হলেই বাবাকে আর পড়াতে আসতে দেবে না। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসায় আসে হরেন বাবুর বিউটি!

সবাই যখন ঘুমিয়ে, তনু তখন জানালাটা খুলে অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে, অন্য সময় হলে ভয় পেতো ও, আজ আর ভয় করছে না কিছুতেই, অন্ধকারে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে ওর। যেন অন্ধকারেই সব প্রশ্নের উত্তর আছে লুকানো। যার হাতে তৈরি সব ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল বড় বড় সব চাকরিজীবী, তার আজ একমাত্র পাঞ্জাবিটা খুলে ধুতে দিতে হয় অন্যের বাড়িতে? অপেক্ষা করতে হয় শুকিয়ে নেওয়ার জন্য। হায়রে মানুষ গড়ার কারিগর! বুকের যন্ত্রণাটা চোখের পানিতে সারারাত ভিজেও কমে না, কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে ওর বুকে। ক্লান্ত হয়ে জানালার পাশেই ঘুমিয়ে পড়ে সকালের দিকে। কাজল ঘর ঝাড় দিতে এসে চেঁচামেচি করতে থাকে, খালা আপনি এমনে জানালা খুইল্লা এই জায়গায় শুয়ে আছেন? কী অইছে আপ্নের খালা? গায়ে হাত দিয়ে চিৎকার করে বলে, আফা। তনু খালার গাও জরে পুইড়া যাইতেছে। শিগগিরই আসেন।

তারপর কয়েকটা দিন তনুর ঘোরের মধ্যে কাটে, সারারাত বাইরের কুয়াশা মাথায় এসে লাগার কারণে জ্বর আসে ওর, সঙ্গে টনছিল বাড়ে। এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়, তার ভেতরেই একটা পাঞ্জাবি কিনে নিয়ে ভদ্র কাকাদের বাড়ি যায় তনু, স্যারকে এবার আনেক রোগা আর বুড়ো মনে হয় ওর। স্যার ওকে দেখেই একইভাবে হেসে বলে, কে রে আমার বিউটি? কেঁদে ফেলে তনু, হ্যাঁ, স্যার আপনার বিউটি, ভেজা গলায় উত্তর দেয় তনু। স্যারকে পাঞ্জাবিটা দিলে, খুব মন খারাপ করেন তিনি, আমার জন্য এটা কেন এনেছিস তুই? তুই এখনো ছাত্র, বাবার টাকা দিয়ে আমারে কিছু দিলে আমি কেন তা নেব? আমারে তুই অপমান করলি বিউটি? তনু কাঁদতে থাকে, স্যারকে যতই বোঝায়, স্যার বলে তুই এটা নিয়ে যা, আমি নেব না। হতাশ হয়ে বসে থাকে তনু, ভালোবাসতে গিয়ে স্যারকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম। এ কি করলাম আমি? ভারাক্রান্ত মনে ভাবতে থাকে তনু।
স্যার সেদিন ভদ্র বাড়ির কাকা-কাকিমার অনুরোধে পাঞ্জাবিটা নিয়েছিল। কিন্তু তনু এক যন্ত্রণাকে বুকের মধ্যে লালন করে বাসায় ফিরল। চাইলেই সবাইকে সব দেওয়া যায় না, কোনো কোনো মানুষকে দিতে গেলেও যোগ্য হতে হয়। সে আগে যোগ্য হবে তারপর স্যারের পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু এক অজানা ভয় আঁকড়ে ধরে ওকে, যোগ্য হতে হতে স্যারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকবে তো? এভাবে সময় পার হতে থাকে। এর মধ্যে তনুর বাবা মারা যায়, বাস্তবতার আঁচড়ে দিশাহারা হয়ে যায় ও, কলেজের পাঠ শেষ করে ঢাকা পড়তে যায় তনু। এর মধ্যে স্যারের আর খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠে না ওর। কেটে যায় কয়েক বছর, তনু ঢাকা থেকে বাড়ি এসে ভাবে এবার স্যারের সঙ্গে দেখা করবেই সে, ছাত্র পড়ানো টাকা থেকে নিয়েছে স্যারের প্রিয় মিষ্টি আর কিছু উপহার। তনুর সঙ্গে ওর আর একজন স্যারও যোগ দিলেন, বললো আমায় নিয়ে চল। আমিও হরেন বাবুর খবর জানি না রে! রওনা দেয় হরেন বাবুর বাড়ির দিকে। তনু আর ওর অনন্ত বাবু স্যার অনেক খুঁজে পেলো হরেন বাবুর বাড়ি।

পাটকাঠি আর বাঁশ দিয়ে তৈরি ঘরটিতে অযত্নের ছাপ, ঘরের টিনের চালের ওপর চালকুমড়ার গাছ শুকিয়ে জঞ্জাল করে রেখেছে, কয়েকটি শুকনো ডাঁটা ঝুলে আছে ঠিক দরজার ওপরেই। বৃষ্টির পানি জমে শ্যাওলা জমেছে উঠানে, উঠানের জায়গায় জায়গায় ঘাস জন্মেছে। ঘাসগুলো দেখে মনে হয় কেউ যত্ন করে নিয়মিত, বেশ সবুজ আর সতেজ। উঠানের একপাশে পাটের চট দিয়ে ঘেরা টয়লেট, ওপরের অংশ ফাঁকা। ঘরের ভেজানো দরজা ধাক্কা দিতেই কড়কড় শব্দ করে খুলে গেলো। একটা চৌকিতে তেল চিটচিটে বিছানায় শুয়ে আছে হরেন বাবু স্যার। আশেপাশে কাউকে দেখতে পেলো না ওরা। স্যারের মাথায় হাত বুলিয়ে তনু ডাকতে গেলো স্যার, স্যার, কিন্তু গলাটা ধরে এলো, ওর ডাক আর বের হলো না। এমন সময় ভেতর থেকে একজন এসে বলল, বাবা তো কাউকে ভালো করে চিনতে পারে না। আমি ডেকে দিচ্ছি। জানা গেলো লোকটা স্যারের ছোট ছেলে। যে দর্জির কাজ করে। লেখাপড়া বেশিদূর করেনি। ছেলের ডাকে স্যার উঠে বসেন, তনুর কাছে গিয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, স্যর আমায় চিনতে পারছেন? সেই হাসি মুখটা নিয়ে আমাদের সবাইকে অবাক করে বলল, তুই আমার বিউটি! নিজেকে কোনো রকম সংবরণ করে কান্নাটাকে হজম করলো তনু। একটা প্লেটে স্যারকে মিষ্টি খেতে দিলো তনু, মুখে বলে, আমার বাবার টাকায় কেনা না এটা স্যার, আজ আপনি রাগ করতে পারবেন না। তনুর কথা শেষ হওয়ার আগেই হরেন বাবু মিষ্টির প্লেটটা কাছে টেনে নিয়েছেন। প্লেটটার ওপর ঝুঁকে একটার পর একটা মিষ্টি মুখে দিয়ে যাচ্ছেন, মিষ্টির রস সারা গা মাখামাখি, স্যারের ছেলে প্লেটটা সরাতে গেলে স্যার আরও শক্ত করে প্লেটটা আঁকড়ে ধরেন। তনু কী করবে বুঝতে পারছে না, প্লেটের সব মিষ্টি মুখে নিয়ে চিবুতে থাকেন স্যার। কাঁশি ওঠে হঠাৎ করে, চোখ বেরিয়ে আসবে যেন। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তনু চিৎকার দিয়ে ওঠে। মেরেই ফেললো বুঝি ও স্যার কে। অনেক কষ্টে সবাভাবিক হলো। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েন স্যার। ওরা বেরিয়ে আসার সময় একজন মহিলা আসেন। তিনি জানান, স্যার তার বাবা। পাশের বাড়িতেই বিয়ে হয়েছে। ও বাড়ির সব কাজ শেষ করে বাবা আর ভাইয়ের জন্য একবেলা এসে রান্না করে দিয়ে যান। ভাইকে বিয়ে করতে বলছে কিন্তু সে করবে না, অন্য ভাইদের বউ দেখে নাকি বিয়ে করার ইচ্ছেটাই চলে গেছে। অন্য ভাইদের কথা জানতে চাইলে বলে, একভাই ব্যাংকে আর একভাই কলেজে চাকরি করে, বউ আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাসা ভাড়া করে শহরে থাকে। তাদের সময় কোথায় বাবার খবর নেওয়ার!

স্যারের সবচেয়ে কম শিক্ষিত ছেলেটি আজ তার পাশে, বিয়েও করছে না, বাবাকে নিজের হাতে সেবা করবে বলে। স্যার বোধ হয় এই মানুষ হওয়ার কথাই বলতেন।

মনটাকে শক্ত করে বাড়ি ফিরে আসে তনু। মনে মনে ভাবে, জীবনে সেই সব মানুষের পাশে দাঁড়াবে ও, যাদের সন্তানদের সময় নেই বাবা-মাকে দেখার, তাহলেই স্যারকে ভালোবাসা হবে। সত্যিকারের মানুষ হওয়া হবে। তার কয়েক দিনের মধ্যেই স্যার মারা যান।তনু যখনই সময় পায় ছুটে যায় বৃদ্ধাশ্রমে, ভালবাসে তাদের, চেষ্টা করে তাদের জন্য কিছু করার। আর ভাবে স্যার দেখছে তো!

হ্যাপি টিচারস ডে ম্যাডাম, ম্যাডাম আপনার চোখে পানি? পঞ্চম শ্রেণীর এক ছাত্র জানতে চাইলে তনু বেরিয়ে আসে তার স্মৃতি থেকে। কই চোখে পানি? নিজেকে আড়াল করে চোখের পানি মুছে নেয় তনু। হাতের ফুলগুলো টেবিলে রেখে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে ক্লাস শুরু করে সে। বলতে থাকে, শোনো, পড়াটাকে সিরিয়াস ভাবে নেওয়ার কিছু নেই, যখন মন চাইবে পড়বে, মন না চাইলে পড়বে না। সবসময় ভালবেসে পড়বে, ক্লাসে প্রথম হওয়ার জন্য পড়বে না। তোমার মন যা চাইবে তাই করবে, মনের কথা শুনবে সবসময়। ভালো রেজাল্ট করার চেয়ে জরুরি ভালো মানুষ হওয়া, বলতে বলতে চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে ওর। পেছনের সারির ছাত্রদের কাছে দাঁড়িয়ে দেখে তার চেয়ারে বসে আছেন হরেন স্যার। সেই হাসিমাখা মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here